জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক শুক্রবার পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভয়াবহ সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় একটি নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এপি এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে. জেনেভায় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জাতিসংঘের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন. আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠিতব্য আঞ্চলিক পরিষদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে যা পুরো উপদ্বীপে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে. জাতিসংঘ মনে করে যে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং মৌলিক মানবাধিকার রক্ষায় এই তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন. স্থানীয় নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের কারণে এই অঞ্চলে political বা রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে.
গত জুন মাস থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত অন্তত ৩১ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে. এই আন্দোলনের নেপথ্যে রয়েছে জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি নামের একটি নাগরিক অধিকার ও ব্যবসায়ী জোট. প্রাথমিকভাবে খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ বিলের অতিরিক্ত শুল্কের প্রতিবাদে এই গণবিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটেছিল. তবে বর্তমানে এই অসন্তোষের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে কাশ্মীরি শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আইনসভার আসনগুলো বাতিলের আইনি লড়াই. এই নাগরিক জোটের দাবি শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত ১২টি আসন বহিরাগতদের স্থানীয় রাজনীতিতে অন্যায় হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিচ্ছে যা তাদের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী.
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এই অঞ্চলে পাকিস্তান সরকারের গৃহীত চরম পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে. বিশেষ করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় এই নাগরিক অধিকার জোটকে নিষিদ্ধ বা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করায় বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে. জাতিসংঘ সতর্ক করে বলেছে যে peaceful assembly বা শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং ভিন্নমত দমনে কঠোর আইনি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী. এই আন্দোলনের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের আটকের পর আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে. বিক্ষোভ দমনের উদ্দেশ্যে পুরো এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে যা স্থানীয় সাধারণ মানুষের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে সংকুচিত করেছে.
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং আইনি নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে কতটা গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে. আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে. তা সত্ত্বেও ইসলামাবাদ প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা জোরদার করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে এবং যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে. সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতেই তারা এই সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করতে বাধ্য হয়েছেন. তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই যুক্তি মানতে নারাজ এবং তারা অবিলম্বে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিচ্ছে.
ইসলামাবাদকে অবিলম্বে এই অঞ্চলের জনগণের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন. আটককৃত নেতাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও সুষ্ঠু বিচারের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তারা বিশেষ জোর দিয়েছেন. কাশ্মীরের স্থানীয় বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভ নিরসনে একটি অর্থপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপের প্রয়োজন বলে জাতিসংঘ মনে করে. কেবল বলপ্রয়োগ বা কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয় বলে মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করেছেন. আগামী দিনগুলোতে এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে উপদ্বীপে মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে.
