মার্কিন মেরিন সেনারা গত বৃহস্পতিবার ওমান উপসাগরে একটি বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারে আরোহণ করে তল্লাশি চালিয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম নিশ্চিত করেছে, রয়টার্স জানিয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে আমেরিকার নতুন নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে একাদশ মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যরা এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। ওমান উপসাগরে এমটি ওয়েন ইয়াও নামের একটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারটিতে হেলিকপ্টার থেকে নেমে সশস্ত্র মার্কিন সেনারা অবস্থান নেয়। সেন্টকমের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অভিযানের একটি ভিডিওচিত্রও প্রকাশ করা হয়েছে যা মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলসীমায় নতুন করে তীব্র উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে। এই ট্যাংকারটি এর আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং এটি ইরান থেকে তেল বহন করছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে গত মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত আটটা থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর এই নতুন নৌ অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর থেকে মার্কিন বাহিনী অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করায় এ পর্যন্ত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ভিন্ন পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং একটি জাহাজকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, গত বুধবার একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে একটি খালি তেলবাহী ট্যাংকারকে আঘাত করা হয় যা আমেরিকার অবরোধ ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই অঞ্চলটিকে একটি ইস্পাতের দেয়ালের মতো অবরোধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে নিয়ম লঙ্ঘনকারী যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। ওমান উপসাগরে এমটি ওয়েন ইয়াও জাহাজটিতে আরোহণ করা ছিল এই সপ্তাহে নতুন করে অবরোধ পুনর্বহালের পর প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ।
এর আগে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী ইরানি বন্দরগুলোতে প্রথম দফায় ব্যাপক নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল। সেন্টকমের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী সেই প্রথম দফার অবরোধের সময় মার্কিন নৌবাহিনী ৯টি জাহাজ নিষ্ক্রিয় করেছিল এবং ১৪০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল। নতুন করে অবরোধ আরোপের এই দ্বিতীয় দফায় তেহরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ইরানি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার এবং আমেরিকার মিত্রদের স্বার্থ বিঘ্নিত করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানিয়েছে যে এই অঞ্চলে আমেরিকার বৈরি আচরণ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীতে তাদের প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ব্যাপক নৌ অবরোধ ও বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন সেনাদের সরাসরি অভিযান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কতটা দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, যার ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন তার সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে এবং ওমান উপসাগরে টহল বৃদ্ধি করেছে। মার্কিন একাদশ মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটের সদস্যরা বর্তমানে ইউএসএস বক্সার নামের একটি উভচর যুদ্ধজাহাজ এবং এর সাথে থাকা অন্যান্য রণতরী নিয়ে এই অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের সমান্তরালে মার্কিন বিমান বাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় উপর্যুপরি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পরিবহন ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করার লক্ষ্যে ষষ্ঠ দিনের মতো এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। গ্রেটার তুনব দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র মজুত ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ড্রোন থেকে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে যা আন্তর্জাতিক সমাজকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি তারা কেবল আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিরাপদ রাখতে এবং ইরানের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
