মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বৃদ্ধির পর উভয় দেশই নতুন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির নানামুখী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে বলে আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয় যে টানা পাঁচ দিন ধরে চলা মার্কিন বিমান হামলা এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি পাল্টা প্রতিশোধের পর পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ইতিমধ্যে উভয় পক্ষ দ্বারা বাতিল ঘোষিত হয়েছে, যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ministry মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি এক সংবাদ সম্মেলনে উভয় পক্ষকে অনতিবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করে টেকসই সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার দাবি করেছেন যে ইরান ওয়াশিংটনের সাথে একটি শান্তি চুক্তি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে কিন্তু তিনি তেহরানকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। এর বিপরীতে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে একটি অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে এবং এই মুহূর্তে পূর্ববর্তী চুক্তি মেনে চলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা কোনো পক্ষেরই এককভাবে নেই। কয়েক দশকের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ সংঘাতের কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ইতিমধ্যে এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ২০১২ সালের ৮,০০০ মার্কিন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে ২০২৪ সালে মাত্র ৫,০০০ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি প্রতিদিন ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে মাত্র ১৫ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। গত জুন মাসে সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরের পর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং সম্পদ অবমুক্ত করার আশায় ইরানি রিয়ালের মান ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও চলতি সপ্তাহে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর মুদ্রাটির মান পুনরায় কমে গেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক সামরিক মূল্যায়নে দেখা গেছে যে গত এপ্রিলের মধ্যে ইরান তার প্রাক-যুদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের ৩০ শতাংশ এবং ড্রোন মজুদের ৬০ শতাংশ ইতিমধ্যেই শেষ করে ফেলেছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ ও আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এই যুদ্ধের গতিপথকে ঠিক কীভাবে প্রভাবিত করবে। পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে ইরানি অবরোধের আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ করে ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম ২.৯৮ মার্কিন ডলার থাকলেও গত মে মাসে তা সর্বোচ্চ ৪.৬৩ মার্কিন ডলারে পৌঁছায় যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে সম্ভাব্য অস্ত্র সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী যেকোনো আন্তর্জাতিক বিরোধের ক্ষেত্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং চুক্তি রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয় (সূরা আল-আনফাল, ৪:১২৮)। পারস্য উপসাগরের গ্রেটার তুনব দ্বীপে নতুন করে মার্কিন হামলার পর এই অঞ্চলের আরব দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা জোরদার করছে যা তেহরানের আঞ্চলিক কূটনীতিকে আরও কোণঠাসা করে তুলতে পারে। এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জানমালের যে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে তা নিরসনে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতা এখন সময়ের দাবি। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা সফল হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
