মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২২শে জুলাই থেকে ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলে ওয়াশিংটন থেকে রয়টার্স ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে. হোয়াইট হাউসের নতুন বাণিজ্য কৌশলের অংশ হিসেবে এই কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে যা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে. মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বুধবার রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন শুল্ক প্যাকেজ ঘোষণা করেন যা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে. এই সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্কে এক বড় ধরণের টানাপোড়েন তৈরি হবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকেরা.
এই নতুন শুল্ক আরোপের প্রক্রিয়াটি ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ধারা ৩০১ এর আওতায় একটি দীর্ঘ এক বছর ব্যাপী তদন্তের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে. মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে ডিজিটাল বাণিজ্য, দুর্বল দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা এবং আমাজন বনাঞ্চলে অবৈধ বন উজাড় করার মতো বিভিন্ন অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণের জন্য ব্রাজিলের ওপর এই ২৫ শতাংশ কর চাপানো হচ্ছে. এই নতুন ব্যবস্থার ফলে ব্রাজিল থেকে আমদানি করা চিনি, পোশাক, কাগজ, ইস্পাত, কৃষি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিসহ হাজার হাজার পণ্যের দাম মার্কিন বাজারে এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যাবে. তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখতে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়াতে কফি, গরুর মাংস, কমলালেবুর রস, উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ এবং খনিজ কাঁচামাল সহ কিছু নির্দিষ্ট পণ্যকে এই শুল্কের আওতাধীন রাখা হয়েছে.
উম্মাহ কণ্ঠের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে এই পদক্ষেপটির পেছনে কেবল বাণিজ্যিক স্বার্থই নয় বরং এক গভীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও জড়িত রয়েছে. ব্রাজিলের বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার সরকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মিত্র ও ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে একটি অভ্যুত্থান চেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত করে বিচার করায় দুই দেশের সম্পর্ক পূর্বে থেকেই চরম উত্তপ্ত অবস্থায় ছিল. মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভালো উদ্দেশ্যে বা সরল বিশ্বাসে আলোচনা করেননি. তিনি অভিযোগ করেন যে লুলা নিজের ব্যক্তিগত অহংকারকে সাধারণ মানুষের কল্যাণের ওপরে স্থান দিয়েছেন এবং এই নতুন শুল্ক হলো ব্রাজিলের লুলার ভুল সিদ্ধান্তের শাস্তি.
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই নতুন ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি কতটুকু বৃদ্ধি পাবে এবং ব্রাজিলের সাথে বাণিজ্য উদ্বৃত্তের সমীকরণ কীভাবে পরিবর্তিত হবে. সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিগত ২০২৫ সালে ব্রাজিলের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে ১,৪৪০ কোটি ডলারের বিশাল উদ্বৃত্ত ছিল যা ২০২৪ সালের ৭৭০ কোটি ডলারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ. প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা এই মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন যে ব্রাজিলের ওপর অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং এর কোনো বাস্তবসম্মত ন্যায্যতা নেই. তিনি যুক্তি দেখান যে বিগত ১৫ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের সাথে বাণিজ্যে ৪২,৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে যা প্রমাণ করে যে ব্রাজিল সবসময় একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রেখেছে.
ইসলামী অর্থনৈতিক আদর্শ অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিচার এবং সততা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শর্ত (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৮)। যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের খাদ্য ও মৌলিক চাহিদার ওপর এমন অতিরিক্ত করারোপ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আগামী দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই কড়া অর্থনৈতিক পদক্ষেপের জবাবে ব্রাজিল সরকার তাদের নিজস্ব বাজারে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা কোনো শুল্ক আরোপ করে ki না এবং দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা নতুন কোনো সমঝোতার দিকে মোড় নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
