ইতালির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দর নগরী জেনোয়ার একটি আদালত বৃহস্পতিবার দেশটির প্রধান মহাসড়ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোভান্নি কাস্তেলুচ্চিকে বিখ্যাত মোরান্দি সড়ক সেতু ধসে ৪৩ জনের মর্মাণ্তিক মৃত্যুর ঘটনায় ১২ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে বলে রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট সংঘটিত এই ভয়াবহ অবকাঠামোগত বিপর্যয়টিকে ইতালির ইতিহাসে অন্যতম সবচেয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৪৩ জনের প্রাণহানির পর দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় শুনতে শত শত ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য এবং গণমাধ্যমকর্মী জেনোয়ার আদালত কক্ষে ভিড় জমান। জেনোয়া সেতু ধস মামলার রায় ঘোষণার সময় আদালত কক্ষে এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যেখানে অনেক স্বজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।
এই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত জোভান্নি কাস্তেলুচ্চি ঘটনার সময় আটলান্টিয়া নামক মূল পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অবহেলাজনিত নরহত্যা এবং সড়ক নিরাপত্তার নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই রায় প্রদান করে। কাস্তেলুচ্চি বর্তমানে ২০১৩ সালে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে আরেকটি বাস দুর্ঘটনার মামলায় পূর্বের একটি ছয় বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন এবং রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর আইনজীবী জোভান্নি পাওলো আচিনি এই রায়কে সত্যের পরাজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন।
এই ঐতিহাসিক মামলায় জোভান্নি কাস্তেলুচ্চির পাশাপাশি আরও ৩১ জন অভিযুক্তকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে মহাসড়ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আউতোস্ত্রাদের প্রাক্তন রক্ষণাবেক্ষণ প্রধান মিশেল ডনফেরি মিটেলিকে ১১ বছরের কারাদণ্ড এবং প্রকৌশল সংস্থা স্পিয়ার সাবেক প্রধান নির্বাহী আন্তোনিনো গালাতাকে সাড়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে মামলায় অভিযুক্ত ৫৭ জনের মধ্যে ৩২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ২৫ জনকে খালাস বা তামাদি আইনের আওতায় মুক্তি প্রদান করা হয়েছে। প্রসিকিউটররা এই মামলায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪০০ বছরের কারাদণ্ডের দাবি জানিয়েছিলেন যা ইতালির ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘতম আইনি প্রক্রিয়া ছিল।
যা কম স্পষ্ট তা হলো এই প্রথম স্তরের রায়ের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার পেতে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে কারণ ইতালির জটিল বিচার ব্যবস্থায় রায় কার্যকরের আগে আরও দুইবার আপিল করার আইনি সুযোগ রয়েছে। ১,১৮২ মিটার দীর্ঘ এই ঐতিহাসিক মোরান্দি সেতুটি ১৯৬৭ সালে নির্মিত হয়েছিল এবং উদ্বোধনের পর থেকেই স্থপতি রিকার্ডো মোরান্দির এই নকশাটি অত্যন্ত সাড়া ফেলেছিল। তবে বছরের পর বছর ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার কারণে সেতুটির একটি বড় অংশ প্রায় দেড়শ ফুট নিচে ভেঙে পড়েছিল। আউতোস্ত্রাদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আররিগো জিয়ানা রায় ঘোষণার আগের দিন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চেয়েছেন।
পবিত্র কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য অপরিসীম এবং যেকোনো দায়িত্বে অবহেলা বা দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হলে তার জন্য পরকালেও জবাবদিহি করতে হবে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)। এই বিপর্যয়ের পর আউতোস্ত্রাদে এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্পিয়া যৌথভাবে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা পরিশোধ করার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক দায় থেকে আগেই নিষ্পত্তি পেয়েছিল। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া পরিবারগুলোর মুখপাত্র এগল পোসেত্তি জানিয়েছেন যে এই রায় অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি প্রথম পদক্ষেপ কিন্তু এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের ফিরিয়ে দেবে না। ইতালির ভঙ্গুর অবকাঠামো ব্যবস্থার সংস্কার এবং বেসরকারি খাতের একচেটিয়া মুনাফা অর্জনের নীতির বিরুদ্ধে এই রায় একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে সাধারণ মানুষ মনে করছেন।
উম্মাহ কণ্ঠের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় রাজনৈতিক ও আইনি বিশেষজ্ঞদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান যে এই রায়টি বিশ্বব্যাপী সেতু ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। এই সেতু ধসের পর মূল অবকাঠামো কোম্পানিটি তাদের মালিকানা রাষ্ট্রীয় কনসোর্টিয়ামের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল যা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সম্পন্ন হয়। নতুন করে নির্মিত সেন্ট জর্জ সেতুটি ২০২০ সালে উদ্বোধন করা হলেও মোরান্দি সেতু ধস মামলার রায় ইতালির শাসনব্যবস্থায় এক গভীর দাগ রেখে গেছে। বিচারক পাওলো লেপ্রি রায় পড়ে শোনানোর সময় আদালত কক্ষে যে পিনপতন নীরবতা ছিল, তা দীর্ঘ আট বছরের পুঞ্জীভূত বেদনার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে।
