সারোগেসি পদ্ধতিতে সন্তান গ্রহণের পর তীব্র অভ্যন্তরীণ সমালোচনার মুখে জার্মানির ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল জোটের সংসদীয় দলীয় প্রধান জেনস স্পানের পদত্যাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে শনিবার আল জাজিরা, এএফপি ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। ছেচল্লিশ বছর বয়সী এই প্রভাবশালী রাজনীতিক চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন এবং ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন জোটের সংসদীয় নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিজের দলীয় আদর্শের পরিপন্থী একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দলের ভেতর থেকেই তাঁর পদত্যাগের জোরালো দাবি উঠেছিল। এই আকস্মিক রাজনৈতিক বিদায়ের ফলে চ্যান্সেলর মার্জ তাঁর অন্যতম প্রধান এবং বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগীকে হারালেন যা দেশটির ক্ষমতাসীন জোটের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করতে পারে।
আমেরিকায় সারোগেসি বা গর্ভভাড়া পদ্ধতির মাধ্যমে জেনস স্পান এবং তাঁর স্বামী এক সন্তানের বাবা হয়েছেন এমন খবর গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রথমাংশে প্রকাশিত হয়। এই পারিবারিক সংবাদটি প্রকাশ্যে আসার পর পরই জার্মানির রক্ষণশীল শিবিরের প্রবীণ নেতাদের পক্ষ থেকে তীব্র সমালোচনা শুরু হয় এবং দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী নীতি ও ভণ্ডামির অভিযোগ তোলে। নিজের আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্রে সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন যে গত কয়েক দিনে তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন যে তাঁর ব্যক্তিগত সুখ অর্থাৎ স্বামীর সাথে একটি নতুন পরিবার শুরু করা এবং বাবা হওয়া তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক পদের সাথে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটদের সংসদীয় নেতা হিসেবে স্পানের প্রধান কাজ ছিল সংসদে চ্যান্সেলর মার্জের সরকারের সমস্ত নীতি ও এজেন্ডা পাস করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নিশ্চিত করা যা জার্মানির জাতীয় রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জার্মানির বিদ্যমান আইন অনুযায়ী সারোগেসি বা গর্ভভাড়া পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হলেও কোনো দম্পতি যদি বিদেশ থেকে এই বিশেষ পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দিয়ে দেশে নিয়ে আসেন তবে সেই সন্তানকে লালন-পালন করার আইনি সুযোগ রয়েছে। স্পানের নিজস্ব রাজনৈতিক দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন এই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বজায় রাখার পক্ষে বরাবরই আব্দুর অবস্থান নিয়েছিল এবং এমনকি বিগত ফেব্রুয়ারি মাসেও তারা সংসদে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছে। শুক্রবার জার্মানির একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের কাছে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে স্পান বলেছিলেন যে তিনি সারোগেসির এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের নৈতিকতার সাথে লড়াই করেছেন এবং এটি কোনো সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মার্জ স্পানের এই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে সঠিক এবং অনিবার্য বলে বর্ণনা করেছেন।
চ্যান্সেলর মার্জ তাঁর পরবর্তী বিবৃতিতে স্পানকে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করার জন্য ধন্যবাদ জানালেও স্পষ্ট করে বলেছেন যে রাজনীতিতে জনসাধারণের বিশ্বাসযোগ্যতা হলো সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। জার্মান চ্যান্সেলর জনসমক্ষে তাঁর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগীর সরাসরি ব্যক্তিগত সমালোচনা করা এড়িয়ে গেলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে সারোগেসি বিষয়ে তাদের রাজনৈতিক দলের বর্তমান কঠোর অবস্থান পরিবর্তন করার কোনো যৌক্তিক কারণ তিনি দেখছেন না। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই প্রভাবশালী নেতার আকস্মিক বিদায়ের পর শূন্য হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় পদটিতে কাকে স্থলাভিষিক্ত করা হবে এবং এটি সরকারের आगामी দিনের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় কোনো দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি করবে কি না। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন খুব শীঘ্রই দলীয় ফোরামে সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
