মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে আবারও এক বড় ধরনের সংঘাতের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে একের পর এক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ইরাকে ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌথভাবে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। আল জাজিরা এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় পুরো অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের বিস্তৃতি নিয়ে তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক মহলেও চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
আল জাজিরার সংবাদ অনুযায়ী, বুধবার ভোরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি জানিয়েছে যে তারা জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম এই হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে তাদের বাহিনী এই অতর্কিত আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করেছে। কোন নির্দিষ্ট সামরিক ঘাঁটি বা লক্ষ্যবস্তুতে এই হামলা চালানো হয়েছিল সে বিষয়ে জর্ডান কর্তৃপক্ষ বা সেন্টকমের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
এদিকে একই দিনে ইরাকের অভ্যন্তরেও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে তাদের সশস্ত্র বাহিনী সেন্টকমের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে অবস্থিত ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ চালিয়েছে। সৌদি পেট্রোলিয়াম স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই অভিযান চালানো হয় বলে দাবি করা হয়েছে। সেন্টকম এবং সৌদি সামরিক বাহিনী যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে যে আইআরজিসির প্রত্যক্ষ নির্দেশেই এই গোষ্ঠীগুলো মার্কিন বাহিনী এবং সৌদি জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়েছিল।
এই যৌথ সামরিক অভিযানের ফলে ইরাকে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ইরাকের রাষ্ট্রীয় অনুমোদিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফ জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বিমান হামলায় তাদের অন্তত কুড়িজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। এছাড়া সাতটি প্রদেশ জুড়ে চলা এই হামলায় বত্রিশ জন আহত হয়েছেন বলেও নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি সুসংগঠিত মোর্চা হলো এই পিএমএফ। বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনেভা, বসরা, কিরকুক, কারবালা এবং দিয়ালার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোতে এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে বলে পিএমএফের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে পিএমএফ কর্তৃপক্ষ, কারণ মাঠপর্যায়ে এখনো উদ্ধারকাজ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি বুধবার তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠক থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা এবং ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির যৌথ অভিযানের মধ্যে কোনটি আগে ঘটেছিল তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। মার্কিন সেন্টকমের পক্ষ থেকে ঘটনার সঠিক ক্রম বা সময়কাল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
এই ঘটনাগুলো কি তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিচ্ছে? আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সামরিক পদক্ষেপগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। অতীতে সীমিত পরিসরে থাকা সংঘাতগুলো এখন সরাসরি দুই পক্ষের বড় শক্তিগুলোর মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নিচ্ছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে কূটনীতির পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে এবং যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। বিশ্ববাসীর এখন একটাই প্রশ্ন, এই সংঘাত কি তবে মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বড় কোনো বৈশ্বিক সংকটের জন্ম দেবে? সময়ই কেবল এর সঠিক উত্তর দিতে পারবে।
