বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ফিফার বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ও মহাদেশীয় প্রতিবাদ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম

ফিফার বিতর্কিত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ও মহাদেশীয় প্রতিবাদ

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফার নতুন বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। ভবিষ্যতে আয়োজিত হতে চলা বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতার অংশবিশেষ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির যে প্রস্তাব ফিফা দিয়েছে, তার জেরে মহাদেশীয় কনফেডারেশনগুলো থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। রয়টার্স এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ যে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবিয়ান এবং এশিয়ার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ফুটবল কর্তারা এই আকস্মিক পদক্ষেপে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের স্পষ্ট অভিযোগ যে কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা বা স্বচ্ছতা ছাড়াই এই বিশাল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

গত মঙ্গলবার ফিফা কর্তৃপক্ষ দুই হাজার কোটি ডলারের একটি বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের ঘোষণা দেয়। যার উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে টুর্নামেন্ট পরিচালনার জন্য বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রায় কুড়ি শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার বিক্রি করা। এই প্রস্তাবের আওতায় ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামক একটি নতুন বাণিজ্যিক বাহক তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে আটচল্লিশ দলের সফল ও সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপ আয়োজনের পর এই নতুন উদ্যোগ সামনে আসে। কিন্তু ফিফা নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার কথা বললেও, সংখ্যালঘু শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তে গোটা ফুটবল বিশ্বে শোরগোল পড়ে গেছে।

কনফেডারেশন অব নর্থ, সেন্ট্রাল আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল বা কনকাকাফ এক কঠোর বিবৃতিতে জানিয়েছে যে তারা সম্পূর্ণ গণমাধ্যমের মাধ্যমেই এই বিষয় সম্পর্কে অবগত হয়েছে। কোনো ধরনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, ফুটবলের সঠিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদী দায়িত্ববোধের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া উচিত। অথচ কোনো অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা না করেই এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এই ধরনের অস্বচ্ছ কার্যপ্রণালী ফুটবলের মূল কাঠামোর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সুরে কথা বলেছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বা এএফসিও। ফুটবলের বাণিজ্যিক প্রসারে নতুন উদ্ভাবনী পদ্ধতির গুরুত্ব স্বীকার করলেও এই ধরনের আকস্মিক ঘোষণায় তারা গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছে। এএফসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে যেকোনো বড় সিদ্ধান্তের আগে যথাযথ পরামর্শ এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বড় ধরনের আর্থিক ও কৌশলগত পরিবর্তনের আগে সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে পর্যাপ্ত তথ্য ও সময় না দেওয়ায় তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এশিয়ার সাতচল্লিশটি এবং কনকাকাফের একচল্লিশটি সদস্য দেশসহ ইউরোপীয় সংস্থা উয়েফার সদস্যরাও এখন এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন।

এর ফলে ফিফার মোট একশো একুশটি সদস্য দেশের ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ফ্রান্সের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান ফিলিপ ডিয়ালো সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে তাদের সংস্থাকেও এই বিষয়ে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। বিনিয়োগ তহবিলগুলোকে সরাসরি ফিফার বাণিজ্যিক সত্তার সঙ্গে যুক্ত করার এই পরিকল্পনা ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এফএ একই রকম উদ্বেগের কথা প্রকাশ করে জানিয়েছে যে বর্তমানের সীমিত তথ্যের ভিত্তিতে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন উয়েফা জরুরি বৈঠকের ডাক দিয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের মূল আত্মাকে বিক্রির পাঁয়তারা চলছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে উয়েফা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রীড়া কমিশনার গ্লেন ম্যাকালেফ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন যে ফিফার নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক স্বার্থের সংমিশ্রণ ঘটার ফলে গুরুতর স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো যদিও দাবি করেছেন যে এর মাধ্যমে অর্জিত সমস্ত অর্থ ফুটবলের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে ব্যয় করা হবে, তবুও বিশ্বজুড়ে যে অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে তা সামাল দেওয়া সহজ হবে না। আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই সংকট কোন দিকে মোড় নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

banner
Link copied!