বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

ভারতে তরুণদের ‘ককরোচ’ আন্দোলন ও সরকারের ভূমিকা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

ভারতে তরুণদের ‘ককরোচ’ আন্দোলন ও সরকারের ভূমিকা

ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে এক অভিনব ও তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তরুণ সমাজের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ’ আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টানা বারো বছরের শাসনের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বৃহৎ যুব অসন্তোষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ যে নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে জমায়েত হওয়া তরুণদের এই আন্দোলন সামাল দিতে গিয়ে একাধারে কঠোর দমনপীড়ন এবং অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের পক্ষে টানার নানামুখী কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকার। সাম্প্রতিক এই রাজনৈতিক পরিস্থিতি গোটা দেশকে এক নতুন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

একাধিক রাজ্য জুড়ে মোদি সরকারের সমর্থিত দল পরিচালিত প্রশাসনগুলোতে এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে শত শত তরুণ বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকের বয়স আঠারো বছরের কম। তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে গত মঙ্গলবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে এই আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া সমস্ত অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। মূলত বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ব্যাপক শিক্ষাগত সংস্কারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির নেতৃত্বে এই প্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল।

শীর্ষ আদালতের এই কঠোর আদেশের আগেই অবশ্য অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা এবং বিশিষ্ট আন্দোলনকারীরা সরকারের এই দমনপীড়ন নীতির তীব্র সমালোচনা করায় প্রশাসন কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হয়। মূলত দেশজুড়ে জনরোষ এড়াতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ভাবমূর্তি রক্ষার্থে সরকার কৌশলগতভাবে কিছু পদক্ষেপ শিথিল করে। তবে আন্দোলন দমনের পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের মন জয় করার জন্য বিভিন্ন পন্থার আশ্রয় নিচ্ছে বিজেপি। শিক্ষা খাতের সংস্কার এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টির ফাঁকা বুলি দিয়ে যুবসমাজকে শান্ত করার চেষ্টা চলছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জটিল বিষয়গুলো দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে এই আন্দোলনের মাধ্যমে। সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভ কেবল নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক একাধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতীকী প্রতিরোধ। সরকারের পক্ষে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই যুব অসন্তোষের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নানা মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে কড়া পদক্ষেপ এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক কৌশলে তরুণদের মন জয় করার এই দ্বিমুখী নীতি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতির কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র বেশ জটিল। দেশের তরুণ প্রজন্ম এখন আর কেবল আশ্বাসের ওপর নির্ভর করতে নারাজ। তারা কাঠামোগত পরিবর্তন এবং সুশাসনের দাবিতে অনড় রয়েছে। আগামী দিনে ভারতের রাজনীতিতে এই যুব শক্তির প্রভাব যে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে, তা বলাই বাহুল্য।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে ভারতের শাসকদল এক অদ্ভুত জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে কড়া প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা, অন্যদিকে রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কায় নমনীয় হওয়ার কূটকৌশল—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে। বিশ্ববাসীর নজর এখন নতুন দিল্লির সিদ্ধান্তের দিকে। তরুণদের এই নতুন রাজনৈতিক স্রোত ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর গতিপথ কোন দিকে নিয়ে যায় এবং সরকার কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে দাঁড়িয়ে ভারতের রাজনীতির ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করছে শাসক ও শোষিতের এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের ওপর।

banner
Link copied!