রাশিয়া ইউক্রেনে প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা সামরিক অভিযানে কখনোই চূড়ান্ত বিজয় দাবি করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী রুশ সাংবাদিক দিমিত্রি মুরাতভ। ক্রেমলিনের ব্যাপক দমনপীড়নের মুখে মস্কোতে নিজের পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার পর বিবিসিকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। মুরাতভ উল্লেখ করেন যে ইউক্রেনকে সাময়িকভাবে ধ্বংস করা সম্ভব হলেও দেশটির জনগণকে কখনো পরাভূত বা জয় করা যাবে না। রয়টার্স ও বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নোভায়া গাজেতা পত্রিকার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান সম্পাদক দিমিত্রি মুরাতভ ২০২১ সালে বাকস্বাধীনতা রক্ষার সাহসিকতার জন্য যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে তার পত্রিকার অন্তত ছয়জন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে কাজের জন্য জীবন দিতে হয়েছে। রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক হামলা শুরুর পর থেকে মুক্ত গণমাধ্যমের ওপর অভূতপূর্ব সেন্সরশিপ আরোপ করে। এর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রীয় আদেশে নোভায়া গাজেতার প্রিন্টিং প্রেস জাতীয়করণ করা হয় এবং পত্রিকার অনলাইন নিবন্ধন বাতিল করা হয়। বর্তমানে রাশিয়ার ভেতরের পাঠকরা কেবল ভিপিএন ব্যবহার করেই এই সংবাদমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণে প্রবেশ করতে পারছেন।
মস্কোর কার্যালয়ে বসে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে মুরাতভ জানান যে তৎকালীন কেজিবি আমলের চেয়েও বর্তমানে রাশিয়ায় ভিন্নমত দমনের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে কথা বলার অপরাধে অন্তত ১,৫০০ জন মানুষকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। অন্যদিকে পুতিন বিরোধী মতামত দানকারী বেশিরভাগ চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীকে সরকারিভাবে চরমপন্থী, সন্ত্রাসী বা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সোভিয়েত জমানার ভিন্নমতাবলম্বী আন্দ্রেই সাখারভের আমলেও রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান হুমকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই নোবেলজয়ী সাংবাদিক। তিনি জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও বিভিন্ন শীর্ষ সম্মেলনে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ৫০০ এরও বেশি বার আলোচনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনুমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ক্রেমলিন প্রধানের মাথায় আদতে কী চলছে তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেভাবে পারমাণবিক সংঘাতকে ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা অত্যন্ত বিপজ্জনক ইঙ্গিত বহন করে।
দুটি প্রতিবেশী স্লাভিক জাতির মধ্যে চলমান এই রক্তাক্ত সংঘাতে ইতোমধ্যে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ হতাহত বা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মুরাতভ বলেন, এত বড় মানবিক ট্র্যাজেডির পর এই যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক না কেন, তাকে কোনোভাবেই বিজয় বলে আখ্যা দেওয়া যায় না। ২০২২ সালে যুদ্ধের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার জন্য নিজের নোবেল মেডেলটি ১০ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারে নিলামে বিক্রি করে দিয়েছিলেন এই প্রবীণ সাংবাদিক। যা কম স্পষ্ট তা হলো, ক্রেমলিনের এই কঠোর সেন্সরশিপের মুখে রাশিয়ার স্বাধীন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে।
