বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌঘাঁটি ও শস্য টার্মিনালে ইউক্রেনের হামলা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৩, ২০২৬, ০৪:২১ পিএম

কৃষ্ণসাগরে রুশ নৌঘাঁটি ও শস্য টার্মিনালে ইউক্রেনের হামলা

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত রাশিয়ার প্রধান সামরিক ও বাণিজ্যিক বন্দর শহর নভোরোসিস্কে একটি বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। রাতের আঁধারে পরিচালিত এই যৌথ অভিযানে রাশিয়ার দুটি মূল শস্য রপ্তানি টার্মিনাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানকার সামরিক নৌঘাঁটিতে থাকা অন্তত চারটি রুশ যুদ্ধজাহাজে আঘাত হানা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনিক সূত্রের তথ্যমতে, এই ড্রোন হামলায় আট বছরের এক শিশুসহ অন্তত তিনজন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন এবং চব্বিশজনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সফল সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

ক্রিমিয়া উপদ্বীপে অবস্থিত সেভাস্তোপোল ঘাঁটিতে ইউক্রেনের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণের কারণে রাশিয়া তাদের কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের বেশিরভাগ যুদ্ধজাহাজ নভোরোসিস্ক বন্দরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। নতুন করে এই বন্দরে হামলা চলায় সেখানকার পুরো সমুদ্র অবকাঠামোর নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আকস্মিক আক্রমণের পর নভোরোসিস্ক শহরে তাৎক্ষণিকভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনের কারণে পুরো শহরের সুপেয় পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কন্দ্রাতিয়েভ জানান, কয়েকশো ড্রোন দিয়ে পুরো অঞ্চলে হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে বহু আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, বন্দর অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে তারা শস্য ও অন্যান্য মালামাল পরিবহনের জন্য বাল্টিক ও কাস্পিয়ান সাগরের বিকল্প পথ ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। বিশ্ববাজারে গম রপ্তানির ক্ষেত্রে রাশিয়া অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হওয়ায় নভোরোসিস্কের শস্য টার্মিনালে এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে শস্যের মূল্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। শিকাগো খাদ্যশস্য বিনিময় কেন্দ্রে গমের ফিউচার মূল্য প্রায় তিন শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বাণিজ্যিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রধান শস্য রপ্তানিকারক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, কৃষ্ণসাগরীয় এই গুরুত্বপূর্ণ রুট অবরুদ্ধ থাকলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে খাদ্য ঘাটতি মারাত্মক রূপ নিতে পারে।

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের ওপর ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে। একই রাতে রাশিয়ার ছোড়া ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও গাইডেড বোমার আঘাতে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিজিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত এগারোজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, রাশিয়ার আকাশপথের এই আক্রমণ প্রতিহত করতে হলে ইউক্রেনের কাছে পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন। তিনি জানান, তাদের প্রয়োজনীয় ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের বড় ঘাটতি রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে আসন্ন শীতকালে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া যাখারোভা ইউক্রেনীয় বাহিনীকে বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং কৃষি অবকাঠামোতে হামলার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি জানান, খাদ্য শৃঙ্খল সচল রাখার পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরে তাদের সামুদ্রিক হুমকি দূর না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়া সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে। দুই হাজার বাইশ সালে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, বন্দর ও শস্য টার্মিনালগুলোতে পাল্টাপাল্টি এই আক্রমণ বাড়তে থাকলে সামনের দিনগুলোতে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর ওপর এর মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

banner
Link copied!