অস্ট্রেলিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় মোড় নিয়ে এসেছে কট্টর ডানপন্থী দল ওয়ান নেশন পার্টি। দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে প্রথমবারের মতো একটি আসনে জয়লাভ করেছে দলটি। নিউ সাউথ ওয়েলসের বিশাল গ্রামীণ নির্বাচনী এলাকা ফারারে ওয়ান নেশন প্রার্থী ডেভিড ফার্লে ঐতিহাসিক এই বিজয় অর্জন করেছেন। গণনা করা ব্যালট পেপার অনুযায়ী ফার্লে প্রাথমিক ভোটের ৬০ শতাংশ পেয়ে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মিশেল মিলথর্পকে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। এই জয়কে অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতির বাইরে থাকা ডানপন্থী পপুলিস্ট দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বিবিসি ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ফলাফল অস্ট্রেলীয় ভোটারদের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।
ফারার আসনটিতে এই উপ-নির্বাচনটি মূলত বিরোধী দল লিবারেল পার্টির নেতা সুসান লে-র পদত্যাগের ফলে তৈরি হয়েছিল। যদিও এই ফলাফলে ক্ষমতাসীন লেবার সরকারের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনো প্রভাব পড়বে না, তবে এটি দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গভীর বার্তা দিয়েছে। গত মার্চ মাসে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার রাজ্য নির্বাচনে ওয়ান নেশন পার্টি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার পর এটিই ছিল দলটির জন্য প্রথম ফেডারেল পর্যায়ের পরীক্ষা। বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই ওয়ান নেশন নেত্রী পলিন হ্যানসন তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন যে এটি কেবল ফারারের জয় নয়, বরং পুরো অস্ট্রেলিয়ার জয়। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন যে তাদের দল এখন অন্য আসনগুলো দখলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কৃষি ব্যবসায়িক পটভূমি থেকে আসা নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডেভিড ফার্লে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে বলেন যে ওয়ান নেশন পার্টি তার সূচনালগ্ন পেরিয়ে এখন একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি অস্ট্রেলীয় গণতন্ত্রের কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রচারণার সময় ফার্লে বারবার উল্লেখ করেছিলেন যে তিনি এবং সাধারণ ভোটাররা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন। তার মতে সংসদ সদস্যরা জনগণের সামনে এক কথা বলেন আর পার্লামেন্টে গিয়ে অন্য কাজ করেন। এই ক্ষোভই মূলত তাকে বিপুল ভোটে জিততে সাহায্য করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে ফারার নির্বাচনী এলাকাটি অত্যন্ত বিশাল। দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়েও বড় এই এলাকাটি ১ লাখ ২৭ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এতে আলবুরি, গ্রিফিথ এবং ডেনিলিকুইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এই আসনটি লিবারেল বা ন্যাশনাল পার্টির দখলে ছিল। ফলে ওয়ান নেশনের এই বিজয় এই দুই ঐতিহ্যবাহী দলের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে লিবারেল পার্টির নতুন নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর এবং ন্যাশনাল পার্টির ম্যাট ক্যানাভানের নেতৃত্বের জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গত বছরের সাধারণ নির্বাচনে লিবারেল-ন্যাশনাল জোট তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিল। তারপর থেকে অন্তর্কোন্দল এবং জনমত জরিপে পিছিয়ে থাকার কারণে দল দুটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রেফারেন্সিয়াল বা পছন্দক্রম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় যেখানে ভোটাররা প্রার্থীদের ক্রমানুসারে ভোট দেন। ওয়ান নেশন পার্টির জন্য এটি একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিজয়। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে দলটির নেত্রী পলিন হ্যানসন নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে নিম্নকক্ষে জয়ী হলেও পরে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেননি। বর্তমানে তিনি উচ্চকক্ষ বা সিনেটের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফারারের এই ফলাফল প্রমাণ করে যে অস্ট্রেলিয়ার ভোটাররা এখন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির সন্ধান করছে।
