শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কামাল মওলা মসজিদকে ‘সরস্বতী মন্দির’ ঘোষণা করল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৫, ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম

কামাল মওলা মসজিদকে ‘সরস্বতী মন্দির’ ঘোষণা করল মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট

ছবি : সংগৃহীত

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধারের ঐতিহাসিক কামাল মওলা মসজিদ বা বিতর্কিত ভোজশালা কমপ্লেক্স নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটল। শুক্রবার মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে এই স্থানটিকে বাগদেবী বা সরস্বতী মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিচারপতি বিজয় কুমার শুক্লা ও বিচারপতি অলোক আওয়াস্থির সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত বেঞ্চ এই রায় প্রদান করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিক তথ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে এই স্থানে মূলত একটি প্রাচীন সংস্কৃত শিক্ষাকেন্দ্র এবং সরস্বতী মন্দির বিদ্যমান ছিল।

আদালত এই রায়ের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের কয়েক দশকের ধর্মীয় ও আইনি সমীকরণ বদলে দিয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছে যে, ভোজশালা মূলত পরমার রাজবংশের রাজা ভোজের সময়কাল থেকে একটি বিশেষায়িত শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিক সাহিত্য থেকে এটি প্রতিষ্ঠিত যে এখানে হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের ধারাবাহিকতা কখনও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। এর আগে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ বা এএসআই (ASI)-এর পক্ষ থেকে আদালতে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই আদালত এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

২০২৪ সালের ১১ মার্চ হাইকোর্ট এএসআই-কে নির্দেশ দিয়েছিল এই স্থাপনার ওপর একটি বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালানোর জন্য। এরপর ৯৮ দিনব্যাপী এক দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এএসআই তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, বর্তমান মসজিদ কাঠামোটি মূলত একটি প্রাক-বিদ্যমান বিশাল হিন্দু মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ও তার বিভিন্ন অংশ পুনরায় ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছিল। সমীক্ষায় প্রাপ্ত বিভিন্ন মুদ্রা, ভাস্কর্য এবং শিলালিপিকে মন্দির দাবির স্বপক্ষে জোরালো প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করে হিন্দু পক্ষ। তবে মুসলিম পক্ষ শুরু থেকেই এই প্রতিবেদনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

আদালত মুসলিম পক্ষকে আলাদা জমি বরাদ্দের নির্দেশ দিয়েছে।

বিচারপতিদের বেঞ্চ রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যেন মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে জেলার অন্য কোনো স্থানে একটি উপযুক্ত জমি বরাদ্দ করা হয়। এর আগে ২০০৩ সাল থেকে প্রচলিত একটি ব্যবস্থা অনুসারে, হিন্দুরা প্রতি মঙ্গলবার এবং মুসলমানরা প্রতি শুক্রবার এই কমপ্লেক্সে তাদের ধর্মীয় আচার পালন করে আসছিলেন। কিন্তু হিন্দু পক্ষ এই একচেটিয়া অধিকার দাবি করে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছিল। মুসলিম পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন যে এই স্থানটি শত শত বছর ধরে কামাল মওলা মসজিদ হিসেবে পরিচিত এবং এখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হতো।

এএসআই-এর দেওয়া তথ্যমতে, ধারের পরমার রাজাদের শাসনামলে নির্মিত এই বিশাল কাঠামোটি বর্তমান মসজিদ নির্মাণের বহু আগে থেকেই ছিল। সমীক্ষায় প্রাপ্ত ৯২টি শিলালিপি ও বেশ কিছু পাথুরে স্তম্ভ বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তবে মুসলিম আবেদনকারীরা জানিয়েছেন যে, এএসআই-এর সমীক্ষা পক্ষপাতদুষ্ট ছিল এবং তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আপিল করার কথা ভাবছেন। মধ্যপ্রদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে এই রায় এক বড় ধরণের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিতে বারানসী ও অযোধ্যার পর ধারের এই ভোজশালা বিতর্ক এখন এক নতুন মোড় নিল। আদালতের রায়ের পর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রায়ের ফলে এখন থেকে ওই স্থাপনায় মুসলিমদের ইবাদতের সুযোগ বন্ধ হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!