আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর আগে চরম অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মরক্কো ফুটবল দল। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়া ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’ এবার আরও বড় স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র তিন month আগে সফল প্রধান কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুইয়ের আকস্মিক বিদায় এবং সেনেগালের সাথে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন) ফাইনালের এক নজিরবিহীন আইনি বিতর্ক দলটির অন্দরমহলে বড় ধাক্কা দিয়েছে।মরক্কোর বর্তমান পরিস্থিতি কাতারের সেই রূপকথার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাবাতে অনুষ্ঠিত আফকন ফাইনালকে কেন্দ্র করে আফ্রিকান ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সংঘাতময় অধ্যায়ের সূচনা হয়। সেনেগালের বিরুদ্ধে গোলশূন্য সমতায় থাকা ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রযুক্তির সাহায্যে মরক্কোকে একটি বিতর্কিত পেনাল্টি দেওয়া হলে সেনেগালের খেলোয়াড়রা প্রতিবাদে মাঠ ছেড়ে চলে যান। এই সিদ্ধান্তের জেরে গ্যালারিতে সেনেগালি সমর্থকদের মধ্যে মারাত্মক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে ১৮ জন দর্শককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দীর্ঘ বিরতির পর খেলা শুরু হলে রিয়াল মাদ্রিদের মরক্কো তারকা ব্রাহিম দিয়াজ ‘প্যানেনকা’ শটে পেনাল্টি মিস করেন এবং অতিরিক্ত সময়ের গোলে সেনেগাল ১-০ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়।
তবে গত মার্চ মাসে আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (সিএএফ) এক নাটকীয় রায়ে সেনেগালের শিরোপা কেড়ে নিয়ে মরক্কোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। সিএএফ-এর যুক্তি ছিল, ম্যাচ শেষ না করে মাঠ ছেড়ে যাওয়ায় সেনেগাল নিয়ম ভঙ্গ করেছে এবং ম্যাচটি মরক্কোর অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। সেনেগাল কর্তৃপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে সুইজারল্যান্ডের ক্রীড়া আদালতের (কাস) শরণাপন্ন হয়েছে এবং সিএএফ ও মরক্কোর বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ এনেছে। অফিশিয়াল টেবিলে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হলেও এই বিষাক্ত রাজনৈতিক ও আইনি লড়াই মরক্কো দলের মানসিক প্রস্তুতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এরই মাঝে গত মার্চ মাসে মরক্কোকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তোলা মাস্টারমাইন্ড কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুইকে কোচের পদ থেকে বরখাস্ত করে ফুটবল ফেডারেশন। দেশের মাটিতে আফকন ফাইনালে হার এবং ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের সাথে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র মতবিরোধের কারণেই মূলত তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। রেগ্রাগুইয়ের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে ৪৯ বছর বয়সী মোহামেদ ওয়াহবিকে, যিনি মরক্কোর অনূর্ধ্ব-২০ দলকে যুব বিশ্বকাপ জেতালেও আন্তর্জাতিক স্তরে মূল জাতীয় দল পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা তার নেই। ফেডারেশন একে একটি ‘কৌশলগত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে বর্ণনা করলেও বিশ্বকাপের ঠিক আগে অনভিজ্ঞ কোচের হাতে দলের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে ফুটবল মহলে তীব্র সংশয় তৈরি হয়েছে।
ফিফা র্যাংকিংয়ের ৮ নম্বরে থাকা মরক্কো দলে এবারও আশরাফ হাকিমি, হাকিম জিয়েশ এবং ব্রাহিম দিয়াজের মতো বিশ্বমানের তারকারা খেলছেন। নতুন কোচ ওয়াহবি দায়িত্ব নেওয়ার পর জানিয়েছেন যে তিনি দল নতুন করে গড়তে আসেননি, বরং বিদ্যমান শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে চান। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে এই কঠিন প্রশাসনিক চাপ সামলে মরক্কো তাদের আগের সাফল্য টপকে যেতে পারবে কিনা, তা দেখার জন্য আগামী ১১ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
