ফুটবল বিশ্বের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। উত্তর আমেরিকা আয়োজিত ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মাঠে নামার মাধ্যমে তিনি লিওনেল মেসি এবং গুইলারমো ওচোয়ার সাথে যোগ দিয়ে রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করবেন। দীর্ঘ ২৩ বছরের ক্যারিয়ারে রোনালদো কেবল পর্তুগালের ফুটবলকেই বদলে দেননি, বরং বিশ্বজুড়ে একটি প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তবে এবারের বিশ্বকাপে ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে ঘিরে পর্তুগালের অভ্যন্তরীণ ফুটবল মহলে চলছে তুমুল বিতর্ক। দল কি তার ওপর নির্ভরশীল থাকবে নাকি নতুন কৌশল গ্রহণ করবে, তা নিয়ে ফুটবল বোদ্ধাদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।
পর্তুগালের অনেক প্রাক্তন খেলোয়াড় এবং বিশ্লেষক মনে করেন, আধুনিক ফুটবলে রোনালদোর খেলার ধরণ কিছুটা মানানসই হওয়ার পথে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সাফল্য পাওয়া আন্তোনিও সিমোয়েস সমালোচনা করে বলেন যে রোনালদো বর্তমানে দলের জয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত অর্জনের দিকে বেশি মনোযোগী। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ইউসেবিওর মতো কিংবদন্তিদের দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক। তবে পর্তুগালের প্রধান কোচ রবার্তো মার্তিনেজ এই সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে রোনালদো তার ফর্ম এবং সক্ষমতার কারণেই দলে রয়েছেন। মার্তিনেজের মতে, সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়কে নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্যের অবকাশ নেই।
পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা। মার্তিনেজ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে রোনালদো ৩১টি ম্যাচে ২৫টি গোল করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে গোল করার সহজাত ক্ষমতা এখনো তার অটুট রয়েছে। তবে পর্তুগালের সাম্প্রতিক কিছু বড় জয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, রোনালদোবিহীন ম্যাচে দল অনেক বেশি ছন্দময় এবং গতিশীল ফুটবল খেলেছে। লাক্সেমবার্গ বা আর্মেনিয়ার বিপক্ষে বড় ব্যবধানের জয়গুলোতে রোনালদো ছিলেন না, যা মিডিয়ার আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, রোনালদোকে ছাড়াও পর্তুগাল একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল হতে পারে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে রোনালদোর সামনে এখন দুটি বড় লক্ষ্য। প্রথমত, পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৯ গোলের রেকর্ডধারী ইউসেবিওকে স্পর্শ করা বা ছাড়িয়ে যাওয়া। বর্তমানে রোনালদোর গোলসংখ্যা আটটি। দ্বিতীয়ত, অধরা বিশ্বকাপ ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়া। ইউসেবিওর রেকর্ড ভাঙার চেয়েও ট্রফি জয় করাটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ঘোচানোর উপায় হতে পারে।
পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সাথে রোনালদোর বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টিও মাঝেমধ্যে আলোচনায় উঠে আসে, তবে ফেডারেশন কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে এর সাথে দলীয় পারফরম্যান্সের কোনো সম্পর্ক নেই। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগালের মিশন শুরু হবে। এই টুর্নামেন্ট রোনালদোর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের এই ফুটবলীয় মহাকাব্যটি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, নাকি অন্য কোনো সমীকরণে পরিণত হয়। ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
