ফুটবলকে সচরাচর বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু ঘটনা রয়েছে যা ক্রীড়াক্ষেত্রকে রক্তক্ষয়ী রাজনীতির সাথে এক করে ফেলেছিল। ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে জায়েরের জাতীয় দলের অংশগ্রহণ এমনই এক করুণ আখ্যান। আফ্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো বড় মঞ্চে পা রাখা এই দলটিকে ঘিরে তখন অঘোষিত কোনো উৎসব ছিল না, বরং ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক লড়াই। দেশটির তৎকালীন স্বৈরশাসক মোবুতো সেসে সেকো ক্রীড়াকে নিজের ক্ষমতার জানান দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে যাওয়ার জন্য ফুটবলারদের গাড়ি, বাড়ি ও মোটা অঙ্কের অর্থের প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রা দ্রুতই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই ২-০ গোলের হার দলটির মনোবল ভেঙে দেয়। এর চেয়েও বড় আঘাত আসে যখন ফুটবলাররা জানতে পারেন, সরকারি কর্মকর্তারা তাদের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এই বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে খেলোয়াড়রা দ্বিতীয় ম্যাচে মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানান। ফিফার চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে নামলেও, সেই প্রতিবাদ তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে জায়ের ৯-০ গোলে পরাজিত হয়। ম্যাচের প্রথমার্ধেই তারা গোল হজম করে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। সেই হার ছিল দলটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। কিন্তু আসল বিপদ অপেক্ষা করছিল এর পরে। দলের শোচনীয় পারফরম্যান্সে ক্ষিপ্ত হয়ে তৎকালীন শাসক মোবুতো সেসে সেকো খেলোয়াড়দের ওপর মৃত্যুর হুমকি পাঠিয়েছিলেন। ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচে যদি চারটির বেশি গোল হজম করে, তবে দেশে ফেরা খেলোয়াড়দের জন্য জেল, নির্যাতন কিংবা নিশ্চিত মৃত্যু অপেক্ষা করছে বলে বার্তা দেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদেরও এই ঝুঁকির মুখে রাখা হয়েছিল।
ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল জায়েরের খেলোয়াড়দের জন্য জীবন বাজি রাখার মতো। দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিল যখন ৩-০ গোলে এগিয়ে যায়, তখন আতঙ্ক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। আরেকটি গোল মানেই কেবল হার নয়, বরং খেলোয়াড়দের জীবনের সমাপ্তি। সেই মুহূর্তেই ইতিহাস বদলে দেন ডিফেন্ডার এমওয়েপু ইলুঙ্গা। ব্রাজিলের রিভেলিনো ফ্রি-কিক নেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে ইলুঙ্গা দেয়াল থেকে ছুটে গিয়ে বলে লাথি মেরে দূরে পাঠিয়ে দেন। সারা বিশ্বের দর্শকরা সেদিন এটিকে পেশাদারিত্বের অভাব বা নিয়ম না জানার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উপহাস করেছিল।
বহু বছর পর ২০১০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইলুঙ্গা সেই ঘটনার পেছনের ভয়ংকর সত্যটি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সেই ঘটনাটি কোনো ভুল ছিল না, বরং তা ছিল সময় নষ্ট করার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। তারা জানতেন, একটি গোল মানেই নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা। ভিআইপি বক্সে বসে থাকা শাসকরা তখন খেলোয়াড়দের প্রাণের মূল্যের চেয়ে নিজেদের ইগোকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। ইলুঙ্গার সেই পদক্ষেপ ছিল এক সাহসী মানুষের নিজের ও সতীর্থদের প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা।
ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে আজ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো নামে দলটি আবার বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরেছে। দীর্ঘ সময় পর তারা বৈশ্বিক ফুটবলের এই আসরে নতুন করে নিজেদের প্রমাণ করতে প্রস্তুত। ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপে তারা কে গ্রুপে লড়বে পর্তুগাল, কলম্বিয়া এবং উজবেকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে। ১৯৭৪ সালের সেই আতঙ্ক আর ভয়ের স্মৃতি পেছনে ফেলে এখন এক নতুন জয়ের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামছে দলটি। ক্রীড়াঙ্গনের সেই অন্ধকার সময়ের সাক্ষী হিসেবে তারা এখন এক নতুন গৌরবের ইতিহাস রচনার পথে।
