ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়রা যখন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন অনেক ফুটবলপ্রেমীর মনে এক গভীর শূন্যতা কাজ করছে। এই বিশ্বকাপে কিছু চেনা মুখের অনুপস্থিতি ফুটবল ভক্তদের জন্য এক করুণ বাস্তবতা হিসেবে সামনে এসেছে। মাঠের লড়াইয়ে জয়-পরাজয়ের সমীকরণের পাশাপাশি দুর্ভাগ্যজনক ইনজুরি এবং কোচদের কঠিন সিদ্ধান্তের কারণে এবারের আসরে অনেক বিশ্বমানের খেলোয়াড়কে দর্শক সারিতে বসে টেলিভিশনের পর্দায় খেলা দেখতে হবে। তাদের অনুপস্থিতি দলের কৌশল এবং ভারসাম্যকে যেমন প্রভাবিত করবে, তেমনি ফুটবল রোমাঞ্চের কিছুটা হলেও অভাব অনুভূত হবে।
ইংল্যান্ডের নতুন ম্যানেজার থমাস টুখেলের অধীনে স্কোয়াড নির্বাচন নিয়ে ফুটবল বিশ্বে আলোচনার ঝড় উঠেছিল। সেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের মতো রাইট-ব্যাক। গত এক বছর রিয়াল মাদ্রিদে কাটানো মৌসুমটি তার জন্য সুখকর ছিল না। চোট এবং ধারাবাহিকতার অভাবে ভুগতে থাকা এই খেলোয়াড়টি টুখেলের রক্ষণাত্মক কৌশলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। একই চিত্র দেখা গেছে কোল পামারের ক্ষেত্রে। চেলসির জার্সি গায়ে গত মৌসুমে ইনজুরির কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকায় পামারের ছন্দপতন ঘটেছিল। যদিও বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠার ক্ষমতা তার রয়েছে, কিন্তু কোচ তাকে শেষ মুহূর্তে দলের বাইরে রাখার ঝুঁকি নিয়েছেন। অন্যদিকে, ম্যানচেস্টার সিটির ফিল ফোডেনের অভিজ্ঞতা এবারের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়ার অন্যতম কারণ। ইংলিশ দলের হয়ে তার বিবর্ণ পারফরম্যান্স এবং পেপ গার্দিওলার ক্লাবে নিয়মিত সুযোগ না পাওয়ায় টুখেলের জন্য তাকে বাদ দেওয়াটা সহজ হয়েছে।
ব্রাজিলের ক্ষেত্রে আঘাতটা এসেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। ফুটবলের জাদুকরী দলটি তাদের আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসা রদ্রিগোকে হারিয়েছে। হাঁটুতে মারাত্মক চোট নিয়ে মাঠের বাইরে চলে যাওয়া রদ্রিগোর অনুপস্থিতি কার্লো আনচেলত্তির ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের মিশনের জন্য এক বড় ধাক্কা। তরুণ প্রতিভার সন্ধান করতে গিয়ে ব্রাজিল এবার এস্তেভাওকেও পাচ্ছে না। ১৯ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালকের হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি পুরো দলের পরিকল্পনার পরিবর্তন এনে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ব্রাইটন থেকে চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর দারুণ মৌসুম কাটানো জোয়াও পেদ্রোকেও শেষ পর্যন্ত স্কোয়াডে নেওয়া হয়নি। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে গোল করতে ব্যর্থ হওয়া এবং কোচের কৌশলে ফিট না হওয়ায় পেদ্রো এখন এক আক্ষেপের নাম।
ইউরোপের অন্যান্য দলের অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়। ফ্রান্সের ফরোয়ার্ড হুগো একিতিকে এবারের বিশ্বকাপে থাকার কথা ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। লিভারপুলের হয়ে ৪৫ ম্যাচে ১৭ গোল করার পরেও গোড়ালির ইনজুরি তাকে মাঠের বাইরে ঠেলে দিয়েছে। ফুটবলের অনিশ্চয়তার আরেকটি বড় শিকার বায়ার্ন মিউনিখের লেনার্ট কার্ল। মাত্র ১৮ বছর বয়সে নিজের অভিষেক মৌসুমে দারুণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এই টিনএজার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বিশ্বকাপের প্রাক্কালে অনুশীলনের সময় আবারো চোটের কবলে পড়ে তিনি কান্নাভেজা চোখে ক্যাম্প ত্যাগ করেছেন। জার্মানির স্বপ্ন সারথি হিসেবে যাকে ভাবা হচ্ছিল, সেই কার্লের অনুপস্থিতি জার্মান সমর্থকদের হৃদয়ে এক বড় ক্ষত তৈরি করেছে।
এই খেলোয়াড়দের বাদ পড়ার পেছনের কারণগুলো কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং আধুনিক ফুটবলের অত্যধিক খেলার ধকলের এক স্পষ্ট প্রতিফলন। বছরের পর বছর বিশ্রামহীনভাবে খেলে যাওয়া খেলোয়াড়দের শরীর আর ধকল সহ্য করতে পারছে না। ফলে বড় আসরের ঠিক আগে অনেকেই ঝরে পড়ছেন। তবে ফুটবল ইতিহাসের এক অলিখিত নিয়ম হলো, একজনের অনুপস্থিতি অন্য কারো জন্য সুযোগের দরজা খুলে দেয়। এই তারকারা দর্শক হিসেবে খেলা দেখলেও, তাদের অভাব পূরণ করতে নতুন কোনো তরুণ হয়তো বিশ্বকাপে নিজেদের নাম খোদাই করে নেবেন। তবুও, মাঠের সেই চিরচেনা জাদুকরদের অভাব ফুটবল প্রেমীরা অবশ্যই অনুভব করবেন। বিশ্বকাপের এই আসরটি যেমন নতুনদের উত্থানের মঞ্চ, তেমনি যারা চোটের কারণে ছিটকে গেছেন তাদের জন্য এটি এক নীরব বেদনার কাব্য হয়ে রইল।
