মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে চলমান ২০ ২৬ ফিফা বিশ্বকাপে মাত্র ৩৩টি ম্যাচে টুর্নামেন্টের দ্রুততম ১০০টি গোল পূর্ণ হয়ে ১৯৫৮ সালের পর একটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড তৈরি হয়েছে বলে বিবিসি স্পোর্ট নিশ্চিত করেছে। নেদারল্যান্ডসের ফরোয়ার্ড কোডি গাকপো সুইডেনের বিপক্ষে ৫-১ ব্যবধানের ম্যাচে দলের চতুর্থ গোলটি করার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরে বিগত ৬৮ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম এত কম সময়ে গোলের সেঞ্চুরি দেখল ক্রীড়াবিশ্ব। এর আগে ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে মাত্র ২০টি ম্যাচে ১০০টি গোল পূর্ণ হয়েছিল যা এখন পর্যন্ত ইতিহাসের দ্রুততম।
চলতি প্রতিযোগিতায় প্রতি ম্যাচে গোলের গড় ৩.০৯ এ দাঁড়িয়েছে যা টুর্নামেন্ট শেষে সর্বমোট ৩০০ গোলের রেকর্ড পার করতে পারে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। মেক্সিকো সিটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর হুলিয়ান কিনোনেসের ১-০ ব্যবধানের প্রথম গোলের পর থেকেই উত্তর আমেরিকার মাঠগুলোতে একের পর এক গোলবন্যা দেখা গেছে। এর মধ্যে হিউস্টনে নবাগত কুরাসাওয়ের বিপক্ষে জার্মানির ৭-১ ব্যবধানের জয় এবং ভ্যাঙ্কুভারে কাতারের বিপক্ষে কানাডার ৬-০ গোলের বড় জয় প্রধান। এর আগে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ এবং ১৯৮২ সালের আসরে ১০০টি গোল পেতে ৩৬টি ম্যাচ লেগেছিল এবং ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা ও ১৯৯৪ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসরে লেগেছিল ৩৮টি করে ম্যাচ। ইউরো ২০২২ জয়ী সাবেক ইংরেজ নারী ফুটবলার এলেন হোয়াইট মন্তব্য করেছেন যে এবারের ম্যাচগুলো কৌশলগতভাবে খুবই আঁটসাঁট হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর গোল হচ্ছে।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা এই গোলবন্যার অন্যতম মূল কারণ হিসেবে ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আডিডাসের তৈরি নতুন ট্রায়োন্ডা বলকে দায়ী করছেন। এই বলটির বিশেষ গঠনশৈলী এবং বাতাসে দ্রুত গতিপথ পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বড় বড় গোলরক্ষকেরা পরাস্ত হচ্ছেন এবং ডি-বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে গোল হজম করছেন। ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে শট নিয়ে সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডিকে পরাস্ত করে এই আসরের একটি চমৎকার দূরপাল্লার গোল উপহার দেন। টুর্নামেন্টের প্রথম পর্বেই ২২ গজের বেশি দূর থেকে পাঁচটি গোল হয়েছে যার মধ্যে সুইডেনের ইয়াসিন আয়রি তিউনিসিয়ার বিপক্ষে দুটি এবং অস্ট্রেলিয়ার কনর মেটকাফ ও ইসমাইল সাইবারি একটি করে গোল করেছেন। সাবেক ইংরেজ গোলরক্ষক জো হার্ট ও পল রবিনসন জানিয়েছেন যে বলের অপ্রত্যাশিত গতির কারণে রক্ষণভাগ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই কঠিন গোলবন্যার মুখে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হচ্ছে টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের গোলরক্ষকদের যাদের মধ্যে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের তিন প্রহরী বিশেষভাবে আলোচিত। ম্যানেজার থমাস টুখেলের অধীনে থাকা ইংল্যান্ড দলের তিন গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড, ডিন হেন্ডারসন এবং জেমস ট্রাফোর্ডের একটি অভূতপূর্ব মিল রয়েছে কারণ তারা সবাই কাম্ব্রিয়ার ছোট ক্লাব কার্লাইল ইউনাইটেডের হাত ধরে উঠে এসেছেন। এই ক্লাবটিকে এখন ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক তৈরির কারখানা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। নিউ জিল্যান্ডের প্রধান গোলরক্ষক ম্যাক্স ক্রোকম্বেও ২০১৬-১৭ মৌসুমে এই কার্লাইল ইউনাইটেড ক্লাবে সময় কাটিয়েছিলেন।
যা কম স্পষ্ট তা হলো নতুন এই প্রযুক্তির ট্রায়োন্ডা বলের আচমকা বাঁক নেওয়া এবং বাতাসের গতিপথ পরিবর্তনের ধাক্কা এই গোলরক্ষকেরা টুর্নামেন্টের পরবর্তী ধাপে কীভাবে সামাল দেবেন। ১৯ বছর বয়সে কার্লাইলে ধারে খেলার সময় জর্ডান পিকফোর্ড একটি ম্যাচে ৬-১ ব্যবধানে হেরে বড় ভুল করেছিলেন কিন্তু দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে আজ ৮৫টি ম্যাচ খেলে দেশের এক নম্বর গোলরক্ষক হয়েছেন। অন্যদিকে ডিন হেন্ডারসন মাত্র ১৩ বছর বয়সে অনূর্ধ্ব-১৫ দলের সাথে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন যেখানে বড়দের শক্তিশালী শটের আঘাতে তার চোখ দিয়ে পানি পড়লেও তিনি দমে যাননি।
ক্রিস্টাল প্যালেসের হয়ে ২০২৫ সালের এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ওমর মারমুশের পেনাল্টি আটকে দিয়ে তিনি দলকে ট্রফি এনে দেন। ম্যানচেস্টার সিটির ২৩ বছর বয়সী তরুণ গোলরক্ষক জেমস ট্রাফোর্ড বার্নলিতে ভালো খেলার পর সিটিতে ফিরলেও সেখানে ইতালীয় জিয়ানলুইজি দোন্নারুম্মাকে দলে নেওয়ায় তাকে ব্যাক-আপ হিসেবে থাকতে হচ্ছে তবে তার শান্ত মানসিকতা এই গোলবন্যায় বড় ভরসা হতে পারে। এর আগে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের জাবুলানি বল নিয়েও একই ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছিল যখন ডেভিড জেমস বলটিকে অত্যন্ত ভয়ংকর বলে উল্লেখ করেছিলেন কারণ সেবার ডি-বক্সের বাইরে থেকে ২৬টি গোল হয়েছিল।
