প্রযুক্তির বিবর্তন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই তবে এর বিনিময়ে আমাদের কিছু সহজাত সক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে কিনা তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ বছর আগে যখন জিপিএস বা স্যাটেলাইট নেভিগেশন জনপ্রিয় হতে শুরু করে তখন গবেষকরা দেখেছিলেন যে মানুষ ধীরে ধীরে তার চারপাশের ভৌগোলিক মানচিত্র মনে রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। এরপর এলো গুগল বা সার্চ ইঞ্জিনের যুগ যেখানে কোনো তথ্য মনে রাখার চেয়ে সেটি কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে তা জানাই মুখ্য হয়ে দাঁড়াল। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর এই জয়জয়কার আমাদের সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার ওপর এক গভীর প্রভাব ফেলছে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে চ্যাটজিপিটি বা ক্লদ-এর মতো টুলগুলোর ওপর অতি নির্ভরতা আমাদের মস্তিষ্ককে অলস করে দিতে পারে।
নিউরোসায়েন্টিস্টদের মতে এআই এমন সব কাজ অনায়াসেই করে দিচ্ছে যার জন্য আগে মানুষকে অনেক মানসিক পরিশ্রম করতে হতো। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক অ্যাডাম গ্রিন মনে করেন যে কোনো নির্দিষ্ট মানসিক কাজ যদি আমরা না করি তবে সেই কাজ করার সক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায় বা অ্যাট্রোফি বা ক্ষয় হতে শুরু করে। তিনি বিষয়টিকে একটি ব্যায়ামাগারের উদাহরণের সাথে তুলনা করেছেন। আপনি যদি জিমে যান এবং আপনার হয়ে একটি রোবট ওজন তোলে তবে আপনার শরীরের কোনো উন্নতি হবে না। এআই ঠিক সেই কাজটিই করছে। এটি আমাদের প্রক্রিয়ার বদলে সরাসরি ফলাফল বা প্রোডাক্ট দিয়ে দিচ্ছে। একটি চমৎকার প্রবন্ধ বা সুন্দর প্রেজেন্টেশন হয়তো সহজেই পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু সেটি তৈরির পেছনে যে মানসিক সংগ্রাম এবং চিন্তার গভীরতা প্রয়োজন ছিল তা বাদ পড়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে গুগল আসার পর মানুষের মধ্যে গুগল ইফেক্ট নামক একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে মানুষ সেই তথ্যগুলো দ্রুত ভুলে যায় যা ইন্টারনেটে সহজে পাওয়া সম্ভব। এআই এই বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। এখন আমাদের কেবল তথ্য খুঁজতেই হয় না বরং চিন্তা করার দায়িত্বও আমরা এআই-এর হাতে তুলে দিচ্ছি। এর ফলে মস্তিষ্কের কগনিটিভ ফ্রিকশন বা চিন্তার ঘর্ষণ কমে যাচ্ছে। এই ঘর্ষণই মূলত মানুষের মস্তিষ্ককে ধারালো রাখে এবং নতুন ও মৌলিক ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে। যদি আমরা নিয়মিত এই চিন্তার লড়াই না করি তবে অদূর ভবিষ্যতে সমাজে মৌলিক ধারণার অভাব দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে সব বিজ্ঞানীর সুর একই রকম নেতিবাচক নয়। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিকাল নিউরোসাইকোলজিস্ট জ্যারেড বেঞ্জ মনে করেন যে এআই ব্যবহার করলেই মস্তিষ্ক নষ্ট হয়ে যাবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তার মতে প্রযুক্তি ব্যবহারে ডিজিটাল ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ হওয়ার কোনো অকাট্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বরং প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কগনিটিভ লোড কমিয়ে দেয় যার ফলে মস্তিষ্ক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পায়। আসল বিষয় হলো আমরা এই প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছি। যদি এআই আমাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করে তবে সেটি আশীর্বাদ কিন্তু যদি এটি আমাদের চিন্তা করার সক্ষমতাকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করে ফেলে তবে সেটি উদ্বেগের কারণ।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এখন গুগল বা ফোনের প্রতিটি পরতে এআই যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নিজের মস্তিষ্ককে সচল রাখতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন যে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত বা সৃজনশীল কাজের শুরুতে এআই-এর সাহায্য না নিয়ে নিজে চিন্তা করা উচিত। প্রথমে নিজের মস্তিষ্ককে খাটানো এবং তারপর এআই দিয়ে সেটি পরিমার্জন করা একটি ভালো অভ্যাস হতে পারে। এটি আপনার মস্তিষ্ককে প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করার সুযোগ দেবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে প্রযুক্তি আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে তৈরি হয়েছে আমাদের বিকল্প হতে নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজের মানুষের মতো চিন্তা করার ক্ষমতা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
