লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কোনো একক বিজয়ী ছাড়াই দ্বিতীয় দফায় গড়িয়েছে। রবিবার অনুষ্ঠিত প্রথম পর্বের ভোটে শীর্ষ দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর কেউই প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশ ভোট পেতে সক্ষম হননি। সরকারি ফলাফল অনুযায়ী, উগ্র ডানপন্থী ব্যবসায়ী ও আইনজীবী আবেরার্দো দে লা এস্প্রিইয়েলা ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন। তার ঠিক পেছনেই ৪১ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন বর্তমান প্রগতিশীল সরকারের মিত্র তথা বামপন্থী সিনেটর ইভান সেপেদা কাস্ত্রো। আগামী ২১ জুন এই দুই বিপরীত মেরুর প্রার্থীর মধ্যে চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণী রানঅফ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
দেশটির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময়টাই এক অভূতপূর্ব সহিংসতায় ঘেরা ছিল। গত এক বছরে ড্রোন হামলা, একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অপহরণ এবং নির্বাচনী জনসভায় একজন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর সশরীরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছিল। এই তীব্র অস্থিতিশীলতার মাঝেই প্রায় ২ কোটি ৩৬ লাখ ভোটার কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। প্রাথমিক বুথফেরত জরিপগুলোতে বামপন্থী নেতা সেপেদাকে এগিয়ে রাখা হলেও শেষ মুহূর্তের গণনায় প্রায় ৬০-এর অধিক আসনে ট্রাম্পপন্থী এস্প্রিইয়েলা নাটকীয়ভাবে ব্যবধান কমিয়ে শীর্ষে চলে আসেন। নির্বাচনে তৃতীয় স্থানে থাকা মধ্যপন্থী রক্ষণশীল প্রার্থী পালোমা ভ্যালেন্সিয়া ইতিমধ্যে দে লা এস্প্রিইয়েলাকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে ভোটের এই ফলাফল নিয়ে কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রাথমিক ভোট গণনায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেত্রো দাবি করেন যে প্রায় আট লাখ অতিরিক্ত ভুয়া ভোট তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিচারকদের দ্বারা ব্যালট পেপারের চূড়ান্ত ও আনুষ্ঠানিক স্ক্রুটিনি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই ফলাফল মেনে নেবেন না। অন্যদিকে শীর্ষস্থান অর্জনকারী এস্প্রিইয়েলা বুলেপ্রুফ কাঁচের আড়াল থেকে দেওয়া ভাষণে তার এই অর্জনকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জয় বলে অভিহিত করেছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই প্রার্থীর জয়ের ওপর কলম্বিয়ার দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সিনেটর ইভান সেপেদা ২০১৬ সালে ফার্ক গেরিলাদের সঙ্গে সরকারের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন। তিনি বর্তমান সরকারের সামগ্রিক শান্তি নীতির সমর্থক, যা সামরিক অভিযানের চেয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংলাপকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। বিপরীত দিকে ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য ভক্ত এস্প্রিইয়েলা এই নরম নীতি সম্পূর্ণ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের মডেলে দেশজুড়ে ১০টি বিশাল কারাগার নির্মাণ ও অপরাধীদের দমনে কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
পেত্রো সরকারের গত চার বছরের মেয়াদে কলম্বিয়ায় কোকেন উৎপাদন রেকর্ড মাত্রায় বেড়েছে এবং সীমান্ত অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এই নিরাপত্তা সংকটের কারণে বামপন্থী প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন, যা এস্প্রিইয়েলার পক্ষে জনমত গঠনে সহায়তা করেছে। যদিও সরকারের প্রগতিশীল অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে দেশে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমেছিল এবং ন্যূনতম মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। লাতিন আমেরিকার এই দেশটির ভোটাররা এখন শান্তি ও কঠোর নিরাপত্তার কোন পথটি বেছে নেবেন, তা আগামী ২১ জুনের ব্যালট যুদ্ধেই নির্ধারিত হবে।
