ভেনেজুয়েলায় গত বুধবার আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৮৫ ঘণ্টারও বেশি সময় পর এগারো বছর বয়সী দুই শিশুকে অলৌকিকভাবে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলে শনিবার দেশটির কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল নিশ্চিত করেছে, বিবিসি নিউজ ও রয়টার্স জানিয়েছে। রিখটার স্কেলে সাত দশমিক দুই এবং সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার এই ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর দেশটিতে এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার চারশত ত্রিশ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, দুর্যোগের পর থেকে এখনো দশ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং ধসে পড়া শত শত ভবনের নিচে আরও বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যের কারাবালেদা নামক স্থানে প্রথম উদ্ধার হওয়া শিশুটির নাম মোইসেস, যাকে প্রায় তিন মিটার গভীর কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। কলম্বিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিট জানিয়েছে যে, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও নিখুঁত উদ্ধার অভিযানের মাধ্যমে দীর্ঘ转换 ছয় ঘণ্টার প্রচেষ্টায় শিশুটিকে নিরাপদে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। রয়টার্সের তথ্যমতে, উদ্ধারের সময় ওয়াকিটকিতে এক উদ্ধারকর্মীকে বলতে শোনা যায় যে, মোইসেসকে তার মা ও বোনের মরদেহের পাশেই জীবিত অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্ধারের পরপরই সূর্যের তীব্র আলো থেকে রক্ষা করতে শিশুটির চোখ ঢেকে দেওয়া হয় এবং উপস্থিত উদ্ধারকর্মীরা হাততালি দিয়ে এই অলৌকিক মুহূর্তকে স্বাগত জানান।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর কারাবালেদা শহরেই একই বয়সী দ্বিতীয় আরেকটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করার ঘোষণা দেন দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও চিত্র প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায় ধ্বংসস্তূপের বিশাল স্তূপ থেকে শিশুটিকে স্ট্রেচারে করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিচে নামিয়ে আনা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ তার বার্তায় উল্লেখ করেন যে, এই চরম সংকটের মুহূর্তে প্রতিটি জীবনই ভেনেজুয়েলার জন্য এক একটি নতুন আশার আলো। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপকূলীয় লা গুয়াইরা অঞ্চলটি এই ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাপকভাবে চালানো হচ্ছে।
দুর্যোগের পর প্রায় চার দিন পার হয়ে গেলেও উদ্ধারকারীরা এখনো আশা ছাড়ছেন না, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে যদি বাতাস ও পানির সুব্যবস্থা থাকে তবে মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে। তবে অনবরত আফটারশক বা মৃদু ভূকম্পনের কারণে উদ্ধার কাজ বারবার ব্যাহত হচ্ছে এবং এটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো ধসে পড়া শত শত বহুতল ভবনের নিচে এখনো ঠিক কতজন মানুষ নিখোঁজ বা আটকা পড়ে আছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে হাজার হাজার মানুষ তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরতে ভয় পাচ্ছেন এবং তারা বিমানবন্দর, গলফ মাঠ বা খোলা জায়গায় নিজেদের গাড়িতে কিংবা তাঁবু খাটিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী দপ্তর ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলাকে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে ইতিমধ্যে দুই হাজারের বেশি বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকর্মী এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিতে লা গুয়াইরায় পৌঁছেছেন। লা গুয়াইরা অঞ্চলের বিমানবন্দর ও সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারী যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে, যা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়িয়ে তুলছে। স্বজনরা এখনো খালি হাতে কিংবা সাধারণ কোদাল দিয়ে কংক্রিটের স্ল্যাব সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে ধসে পড়া দেয়ালের ওপার থেকে এখনো তাদের প্রিয়জনদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে।
