বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩

১৯৩৯ সালের পিকনিক ও যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বিশেষ সম্পর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

১৯৩৯ সালের পিকনিক ও যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বিশেষ সম্পর্ক

ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার ঐতিহাসিক যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টির পেছনে ১৯৩৯ সালের একটি রাজকীয় পিকনিকের ভূমিকা নিয়ে লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড থিয়েটারে ‍‍`স্প্রিংউড‍‍` নামের একটি নতুন নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে বলে বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। নাট্যকার রিচার্ড নেলসন এই নাটকের মূল কাহিনী আবর্তন করেছেন তৎকালীন ব্রিটিশ রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও রানী এলিজাবেথের নিউ ইয়র্কের হাইড পার্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের গ্রামীণ বাসভবন পরিদর্শনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এটি ছিল কোনো ক্ষমতাসীন ব্রিটিশ সম্রাটের প্রথম মার্কিন ভূখণ্ডে পদার্পণের ঘটনা, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক মাস আগে ঘটেছিল। নাটকটিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে সাধারণ হট ডগ এবং অনানুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন জনমতকে একাকীত্ব বা বিচ্ছিন্নতাবাদ থেকে সরিয়ে ব্রিটেনের পক্ষে আনা হয়েছিল।

১৯৩৯ সালের শুরুর দিকে ইউরোপে নাৎসি বাহিনীর চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণের পর বিশ্বজুড়ে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে আসন্ন সশস্ত্র সংগ্রামে ব্রিটেনের টিকে থাকার জন্য মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। তবে তিনি একটি গভীরভাবে বিভক্ত মার্কিন জনমতের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যাদের সিংহভাগই আরেকটি ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়ানোর তীব্র বিরোধী ছিল। ব্রিটিশ রাজতন্ত্রকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে উপস্থাপন করার জন্য রুজভেল্ট তাঁর জন্মস্থান স্প্রিংউডে একটি সাধারণ সপ্তাহান্তের সমাবেশের পরিকল্পনা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজকীয় দম্পতিকে দূরবর্তী কোনো শাসক হিসেবে না দেখিয়ে একটি গণতান্ত্রিক মিত্র দেশের বন্ধুসুলভ প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা।

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৩৬ সালের পদত্যাগ সংকটের পর ব্রিটিশ রাজপরিবার নিজেই এক ধরণের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, যা রাজা ষষ্ঠ জর্জকে আকস্মিকভাবে সিংহাসনে বসিয়েছিল। ৪৩ বছর বয়সী এই সম্রাট তীব্র তোতলামির সমস্যায় ভুগছিলেন এবং তাঁর ক্যারিশম্যাটিক বড় ভাইয়ের তুলনায় জনসাধারণের সামনে কথা বলতে বেশ দ্বিধাবোধ করতেন। এই পরিদর্শনের সময় ককটেল এবং ব্যক্তিগত আলোচনার মাধ্যমে দুই নেতার মধ্যে যে অভূতপূর্ব বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল, তা যুদ্ধকালীন সহযোগিতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। রুজভেল্ট নিজের পোলিও আক্রান্ত জীবনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতার অভিজ্ঞতা রাজার সাথে ভাগ করে নেন, যা তাদের মধ্যে একটি তাৎক্ষণিক মানসিক বন্ধন তৈরি করেছিল।

যা কম স্পষ্ট তা হলো বর্তমান যুগের কূটনৈতিক কৌশলে বিশ্ব নেতাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের গভীর প্রভাব আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না। সেই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সপ্তাহান্তে একটি বহিরঙ্গন পিকনিক অন্তর্ভুক্ত ছিল যেখানে রাজকীয় অতিথিদের বিখ্যাত মার্কিন খাবার হট ডগ পরিবেশন করা হয়েছিল। রাজা ষষ্ঠ জর্জ মার্কিন নিরপেক্ষতা আইন লঙ্ঘন না করে কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সহায়তা করতে পারে সে সম্পর্কে রুজভেল্টের কৌশলগত ধারণার বিশদ নোট নিয়েছিলেন। এইshared অন্তর্দৃষ্টিগুলো পরবর্তী যুদ্ধকালীন বছরগুলোতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিকে পরিচালিত করেছিল, যা প্রমাণ করে যে অনানুষ্ঠানিক জমায়েতও বৈশ্বিক জোটকে পুনর্গঠন করতে পারে।

ফার্স্ট লেডি এলিনর রুজভেল্ট এবং প্রেসিডেন্টের মা সারা রুজভেল্টও এই ঐতিহাসিক পরিদর্শনের সময় পারিবারিক পরিবেশ পরিচালনায় ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফার্স্ট লেডি রানী এলিজাবেথের মার্জিত স্বভাবের প্রশংসা করলেও লক্ষ্য করেছিলেন যে ব্রিটিশ রানী কিছুটা রাজকীয় আভিজাত্য বজায় রাখতেন। এই নাট্য প্রযোজনাটি এই জটিল পারিবারিক গতিশীলতার পাশাপাশি সেই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলোকে তুলে ধরে যা শেষ পর্যন্ত আধুনিক ইতিহাসের গতিপথকে বদলে দিয়েছিল। বর্তমানে ইউরোপে যখন নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন এই নাটকটি মনে করিয়ে দেয় কীভাবে সহানুভূতি ও অপ্রচলিত কূটনীতির মাধ্যমে ঐতিহাসিক যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল

banner
Link copied!