বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ১ শ্রাবণ ১৪৩৩

জেনোয়া সেতু বিপর্যয় মামলায় রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইতালির আদালত

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১৬, ২০২৬, ০৫:৪৩ পিএম

জেনোয়া সেতু বিপর্যয় মামলায় রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইতালির আদালত

ইতালির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দর নগরী জেনোয়ায় একটি মহাসড়কের সেতু ধসে ৪৩ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত ঐতিহাসিক মামলার প্রথম রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে দেশটির একটি স্থানীয় আদালত বলে রয়টার্স ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার জেনোয়ার একটি বিশেষ আদালতে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রথম স্তরের রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট প্রবল ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে জেনোয়ার বিখ্যাত মোরান্দি সড়ক সেতুটি আকস্মিকভাবে ভেঙে পড়েছিল, যার ফলে বহু যানবাহন ও আরোহী প্রায় দেড়শ ফুট নিচে পতিত হয়। ভয়াবহ এই অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের পর দীর্ঘ তদন্ত শেষে মোট ৫৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং সরকারি পরিদর্শকের বিরুদ্ধে গাফিলতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে এই অপরাধমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

এই ঐতিহাসিক মামলায় অভিযুক্ত ৫৭ জন আসামির মধ্যে মহাসড়ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আউতোস্ত্রাদে পার লিতালিয়ার তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোভান্নি কাস্তেলুচ্চি অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে রয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিরা এই মামলায় সব আসামির জন্য সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪০০ বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানিয়েছেন, যেখানে জোভান্নি কাস্তেলুচ্চির জন্য সর্বোচ্চ সাড়ে ১৮ বছরের কারাদণ্ডের দাবি করা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে মূলত অবহেলাজনিত নরহত্যা, যাতায়াত ব্যবস্থার নিরাপত্তা বিপন্ন করা এবং সরকারি নথিপত্র জাল করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আসামিরা শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আনিত সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং দাবি করছেন যে এই দুর্ঘটনাটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাব নয় বরং মূল নকশার একটি গোপন ত্রুটির কারণে ঘটেছিল।

ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে ১৯৬৭ সালে উদ্বোধনের পর থেকে পরবর্তী ৫১ বছরে এই সেতুর ৯ নম্বর পিলারের তার ও কংক্রিট শক্তিশালী করার জন্য ন্যূনতম কোনো রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়নি। যদিও একই সময়ে সেতুর ১০ ও ১১ নম্বর পিলারে সংস্কার কাজ করা হয়েছিল এবং ৯ নম্বর পিলারের জন্যও সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল কিন্তু মুনাফা বৃদ্ধির আশায় সেই কাজ বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়। বিচার চলাকালীন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওয়াল্টার কোতুগনো এই সেতুটিকে একটি চলন্ত টাইম বোমা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হতে পারত। এই দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রায় ২৮৪টি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে শত শত কারিগরি প্রমাণ, প্রকৌশলীদের মূল্যায়ন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে যা ইতালির বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম আইনি প্রক্রিয়া।

যা কম স্পষ্ট তা হলো এই প্রথম স্তরের রায়ের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চূড়ান্ত বিচার পেতে ঠিক কতদিন অপেক্ষা করতে হবে কারণ ইতালির জটিল আইনি ব্যবস্থায় আপিল প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এই ঘটনার পর তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে তৎকালীন ইতালীয় সরকার সেতু পরিচালনাকারী মূল হোল্ডিং কোম্পানি আতলান্তিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা নিয়ন্ত্রক বেনেকটন পরিবারকে তাদের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করেছিল। ২০২২ সালে আউতোস্ত্রাদে এবং তার সহযোগী রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্পিয়া যৌথভাবে ২৯ মিলিয়ন ইউরো জরিমানা প্রদানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ফৌজদারি দায় থেকে অব্যাহতি পেলেও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত দায় বহাল থাকে। দুর্ঘটনার শিকার হওয়া মাত্র দুটি পরিবার কোম্পানির দেওয়া বিশাল ক্ষতিপূরণ প্রত্যাখ্যান করে আদালতে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

মোরান্দি সেতু ধসের এই বিপর্যয়টি কেবল ইতালির অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর জরাজীর্ণ দশাকেই উন্মোচিত করেনি reseller বরং বেসরকারি খাতের হাতে গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তা ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকিগুলোকেও সামনে এনেছিল। আউতোস্ত্রাদের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আররিগো জিয়ানা রায় ঘোষণার প্রাক্কালে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সমগ্র ইতালীয় জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চেয়ে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে এই মর্মাণ্তিক দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাচ্ছেন যেন এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি আর কখনো না ঘটে। নিহতদের স্বজনদের গঠিত কমিটির প্রধান এগল পোসেত্তি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে এই রায় তাদের প্রিয়জনদের ফিরিয়ে দেবে না তবে সত্য উন্মোচিত হওয়া তাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি ছিল।

banner
Link copied!