মঙ্গলের রহস্যময় উপগ্রহগুলো অন্বেষণ করতে এবং সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পৃথিবীতে ফিরে আসতে মঙ্গলবার মহাকাশে একটি মহাকাশযান পাঠিয়েছে জাপান। বিশ্বের পাঁচটি মহাকাশ গবেষণা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই পাঁচ বছরব্যাপী অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো মঙ্গলের দুই ছোট উপগ্রহের মধ্যে তুলনামূলক বড় ও কাছে থাকা ফোবোসের পৃষ্ঠে একটি রোবটিক ল্যান্ডার ও রোভার নামানো।
জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সির নেতৃত্বে পরিচালিত এই নমুনা সংগ্রহের অভিযানে তানেগাশেমা দ্বীপের প্রধান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে ভোরের আগেই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের এক ঘণ্টা পর যানটি রকেটের ওপরের অংশ থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী সফলভাবে আলাদা হলে সফলতার ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় ফ্লাইট কন্ট্রোলারের কর্মকর্তারা আনন্দে মেতে ওঠেন এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
গত ৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে নয়টি মহাকাশযান মঙ্গলে অবতরণ করালেও এবং চীন ২০২১ সালে সাফল্য পেলেও কেউ কখনো ফোবোস বা ডিমোসে পা রাখেনি। এমনকি মঙ্গলের উপগ্রহ তো দূরের কথা, লাল গ্রহটি থেকেই এখনো কেউ কোনো নমুনা এনে পৌঁছাতে পারেনি। এই অভিযান সফল হলে আগামী ২০৩১ সালে ফোবোসের ধূলিকণা, মাটি এবং পাথর পৃথিবীতে এসে পৌঁছাবে।
প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নাসা জ্যোতির্বিজ্ঞানী টম স্ট্যাটলার বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের মধ্যে প্রচুর উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ কাজ করছে। এর আগে দুটি গ্রহাণু থেকে সফলভাবে নমুনা ফিরিয়ে আনার অভিজ্ঞতা থাকায় এই যাত্রায় জাপান কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
ফোবোস হলো মাত্র ২২ কিলোমিটার বা এর কাছাকাছি ব্যাসের একটি গোল আলু আকৃতির পাথুরে উপগ্রহ। এর টুকরো টুকরো অংশ পরীক্ষা করে মঙ্গলের উপগ্রহগুলো এবং অন্যান্য গ্রহের উপগ্রহ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন বা এমএমএক্স নামের এই অভিযানের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮ কোটি ডলার এবং পাঁচ টন ওজনের ভারী মহাকাশযানটি আগামী গ্রীষ্মের শেষের দিকে মঙ্গলে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
লাল গ্রহের চারপাশে ফোবোসের কক্ষপথের সঙ্গে এটি নিজেকে মানিয়ে নেবে এবং পরবর্তীতে ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথভাবে তৈরি আইডেফিক্স নামের রোভারটি বাইরে ফেলে দেবে। একটি মাইক্রোওয়েভ ওভেনের চেয়ে বড় নয় এমন আইডেফিক্স নিজেই ফোবোসের ওপর নেমে আসবে এবং কম মহাকর্ষ বলের কারণে স্থির হওয়ার আগে কয়েক মিনিট ধরে লাফাতে থাকবে।
চার চাকার এই রোভারটি উল্টো হয়ে পড়লেও নিজে থেকেই সোজা হয়ে যাওয়ার মতো করে নকশা করা হয়েছে। তবে ফরাসি মহাকাশ সংস্থার জুলিয়ান বারুখ সতর্ক করে বলেছেন, রোভারটি যদি নরম মাটিতে গেঁথে যায় বা পাথরের ফাঁকে আটকে যায়, তবে কোনো কৌশলই কাজে লাগবে না। একবার সোলার প্যানেলগুলো খুলে গেলে যানটি আর নিজেকে সোজা করতে পারবে না, আর সে কারণেই এটি সেকেন্ডে মাত্র এক মিলিমিটার অত্যন্ত ধীর গতিতে চলবে।
ফোবোসে ১০০ দিন ঘুরে বেড়ানোর সময় আইডেফিক্স একটি নিরাপদ স্কাউট হিসেবে কাজ করবে। মাদারশিপটি যখন ২০২৮ সালের শেষ দিকে বা পরের বছর উপগ্রহটির পৃষ্ঠে নেমে নমুনা সংগ্রহ করবে, তখন জাপানি ফ্লাইট কন্ট্রোলাররা পাউডারের মতো নরম মাটি এবং এবড়োখেবড়ো ভূখণ্ড এড়িয়ে চলতে চান। ল্যান্ডারটি ফোবোসে মাত্র দুই ঘণ্টা সময় কাটাবে এবং সেখানে ড্রিল করে অন্তত ৯ গ্রামের মতো উপাদান ভ্যাকুয়ামের সাহায্যে টেনে নিয়ে আবার মহাশূন্যে রওনা হবে।
২০৩০ সালে মঙ্গলের আশপাশ ছাড়ার আগে মহাকাশযানটি বেশ কয়েকবার ডিমোসের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়ে তা পর্যবেক্ষণ করবে এবং পরবর্তীতে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে ফিরে এসে ২০৩১ সালে সংগৃহীত নমুনাগুলো পৌঁছে দেবে। মঙ্গলের উপগ্রহগুলো অধ্যয়নের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে চান ফোবোস ও ডিমোস অতীতে মঙ্গলের সঙ্গে কোনো ভারী মহাকাশ পাথরের সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয়েছিল কি না। এছাড়া এগুলো মঙ্গলের মহাকর্ষের টানে আটকা পড়া ভবঘুরে গ্রহাণুও হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন ফোবোসে মঙ্গলের কিছু চিহ্ন পাওয়া যাবে, যার ফলে এই নমুনাগুলো গ্রহ এবং উপগ্রহের গঠন রহস্য উন্মোচনে দুই ধরনের সাহায্যই করবে। এই অভিযানে জাপান ৩৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। এছাড়া নাসা ৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার, ফরাসি মহাকাশ সংস্থা প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার, জার্মান মহাকাশ সংস্থা প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা ১ কোটি ৭০ লাখ ডলার দিচ্ছে।
