বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

ইয়েমেনে অবরোধ

তাইজে হুতিদের কঠোর অবরোধ: চরম মানবিক সংকটে ১৫ লাখ মানুষ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

তাইজে হুতিদের কঠোর অবরোধ: চরম মানবিক সংকটে ১৫ লাখ মানুষ

দক্ষিণ ইয়েমেনের তাইজ শহরে হুতি বিদ্রোহীদের দীর্ঘ এক মাসের অবরোধের কারণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। এই পরিস্থিতি সেখানে চরম মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে। তাইজ গভর্নরেটের একদম দক্ষিণ-পশ্চিমের শহর আল-তুরবাহ দখল এবং এর পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামাঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর থেকেই এই অবরোধ শুরু হয়।

এই সামরিক পদক্ষেপের ফলে তাইজের সঙ্গে আদেন ও বাইরের দুনিয়ার সংযোগকারী মূল মহাসড়কটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে চরম বিপাকে পড়ে সাধারণ মানুষ।

মক্কায় ওমরাহ পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে এই অবরোধের মুখে পড়েন আহমেদ আল-মিখলাফি ও তার পরিবার। তারা যখন বাইরে ছিলেন, তখন হুতিদের সঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় তাদের ফেরা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পিছিয়ে যায়। আদেনে পৌঁছানোর পর তারা দেখতে পান যে হাইজাত আল-আদ থেকে আল-তুরবাহ যাওয়ার প্রধান রুটটি বন্ধ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের একটি ভাঙাচোরা বিকল্প সড়ক বেছে নিতে হয়।

আহমেদ জানান, পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্রামাঞ্চলে নতুন করে স্থাপন করা প্রায় ২০টি হুতি চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হয়েছে তাদের। দুপুরবেলা শহরের প্রবেশপথ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে একটি চেকপোস্টে চলমান সংঘর্ষের কারণে তাদের গাড়ি থামিয়ে দেওয়া হয় এবং পেছনের দিকে ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তার স্ত্রী উম্ম আদাম জানান, তিন সন্তানকে নিয়ে এই যাত্রা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, যাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স পাঁচ বছরের কম। কিন্তু তাদের সামনে কোনো বিকল্প খোলা ছিল না।

পরিবারটি একটি ছোট গ্রামীণ হোটেলে দুই দিন অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। সেখানে নয়জন নারী ও শিশু একটিমাত্র রুমে গাদাগাদি করে ছিলেন এবং পুরুষরা ছিলেন অন্য একটি রুমে। আহমেদ জানান, হোটেলের প্রতিটি রাতের জন্য তাদের ১০০ সৌদি রিয়াল বা ২৬ দশমিক ৬৬ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। যাত্রীবাহী পরিবহনের ভাড়াও অনেক বেড়ে গেছে। সংঘাতের আগে যেখানে জনপ্রতি ভাড়া ছিল ৩৫ সৌদি রিয়াল, তা বেড়ে এখন ১০০ সৌদি রিয়ালে দাঁড়িয়েছে।

এই অবরোধের কারণে তাইজ শহরের ১৫ লাখ বাসিন্দার পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকার মানুষজনও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এর মধ্যে চলমান সংঘাতে আটকে পড়া প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষও রয়েছে। গভর্নরেটের অবরোধ বিষয়ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সালাহ আহমেদ ঘালেব আল-মাজিদি ২০১৪ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইয়েমেনের কোনো শহরে এটিকেই সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর অবরোধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

শহরটিতে খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসা সামগ্রী ও পানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এবং নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার না করায় তা রাস্তায় জমা হয়ে স্তূপ হয়ে গেছে।

আল-মাজিদি আরও জানান, সড়ক বন্ধ থাকার কারণে তাইজ শহর ও এর আশপাশের গ্রামীণ এলাকার মানুষের মধ্যে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, যা পারিবারিক বন্ধনকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে গ্রামের রোগীরাও তাইজের ভেতরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছাতে পারছেন না। গভর্নরেটের স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য কর্মকর্তা তাইসির আল-সামেই জানান, জ্বালানি ও চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটের মধ্যে অবরোধের দ্বিতীয় সপ্তাহ শেষে শহরের হাসপাতালগুলোতে রোগীর আসা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

যাদের বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন, তারাও এই শহরের সীমানার ভেতরে আটকা পড়েছেন। লিভারের এনজাইমজনিত দীর্ঘস্থায়ী জটিলতায় ভোগা এক তরুণ সাংবাদিক জানান, হুতি বাহিনী কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে আসার পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। কায়রোর তার চিকিৎসক তাকে অবিলম্বে বিদেশ যাওয়ার পরামর্শ দিলেও, এই সাংবাদিক জানান যে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একমাত্র প্রস্থান পথ দিয়ে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব, কারণ তাদের বিরুদ্ধে তার সাংবাদিকতা করার রেকর্ড রয়েছে।

banner
Link copied!