বিশ্বজুড়ে সংক্রামক ব্যাধির নতুন নতুন প্রকোপ যখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে, তখন দক্ষিণ আমেরিকাগামী একটি প্রমোদতরীতে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে মুখ খুলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শুক্রবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামক একটি প্রমোদতরীতে এখন পর্যন্ত মোট ছয়জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আক্রান্তদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে এই ঘটনা নিয়ে আতঙ্কিত না হতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই প্রাদুর্ভাব কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ এবং এটি করোনা ভাইরাসের মতো কোনো নতুন বৈশ্বিক মহামারির সংকেত নয়।ডব্লিউএইচও’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে যে আক্রান্ত ছয়জনই ‘অ্যান্ডিস ভাইরাস’ নামক হান্টাভাইরাসের একটি বিশেষ ধরনে সংক্রমিত হয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বর্তমানে ওই প্রমোদতরীর সকল যাত্রী ও ক্রু সদস্যদের কঠোরভাবে মাস্ক পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যারা আক্রান্তদের খুব কাছাকাছি গিয়েছেন বা তাদের সেবা দিয়েছেন, তাদের জন্য উন্নত মানের ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম বা পিপিই ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাহাজের অভ্যন্তরে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বিশেষ স্যানিটাইজেশন ড্রাইভও চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া ভ্যান কারকোহভ একটি সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে, হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর পদ্ধতি কোভিড-১৯ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো নয়। এটি বাতাসের মাধ্যমে খুব দ্রুত জনপদে ছড়িয়ে পড়ে না। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির অত্যন্ত কাছাকাছি সংস্পর্শে এলে অথবা ভাইরাসে আক্রান্ত ইঁদুরের মলমূত্র বা লালার সংস্পর্শে এলে মানুষ এতে সংক্রমিত হয়। মারিয়া জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই বৈশ্বিক মহামারির শুরু হিসেবে দেখা উচিত হবে না। তার মতে, এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট জাহাজের প্রাদুর্ভাব এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে যে, আক্রান্তদের মধ্যে থাকা এক দম্পতি সম্প্রতি আর্জেন্টিনা, চিলি ও উরুগুয়েতে পাখি পর্যবেক্ষণের একটি সফরে গিয়েছিলেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, তারা সেই সফরের সময় এমন কোনো বনাঞ্চল বা গ্রামীণ এলাকায় গিয়েছিলেন যেখানে হান্টাভাইরাস বহনকারী নির্দিষ্ট প্রজাতির ইঁদুরের অবাধ বিচরণ ছিল। সেখান থেকেই তারা সংক্রমিত হয়ে জাহাজে ফিরে আসেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস ঘেব্রেয়েসাস জানিয়েছেন যে, এই প্রাদুর্ভাবের উৎস এবং সংক্রমণ প্রক্রিয়াটি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার জন্য তারা আর্জেন্টিনার স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন।
যদিও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আক্রান্তের সংখ্যা আগামী কয়েক দিনে কিছুটা বাড়তে পারে, তবে এটি নিয়ে জনমনে গণ-উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। হান্টাভাইরাস সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে ছড়ায় এবং এটি কোনো জনাকীর্ণ পরিবেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বড় ধরণের বিপর্যয় তৈরি করার সক্ষমতা রাখে না। তবে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বনাঞ্চল বা পাহাড়ি এলাকায় যাওয়ার সময় ইঁদুর বা বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। বর্তমানে এমভি হন্ডিয়াস জাহাজটিকে বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং যাত্রীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে।
