পবিত্র হজ ২০২৬-কে সামনে রেখে হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রিত ওষুধের অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে বিশেষায়িত বা নিয়ন্ত্রিত ওষুধ (Controlled Medicines) সঙ্গে রাখার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এনে নতুন নীতিমালা জারি করেছে সৌদি ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অথরিটি (এসএফডিএ)। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী নারকোটিক বা সাইকোট্রপিক উপাদানে তৈরি ওষুধ বহনের জন্য এখন থেকে হজযাত্রীদের আগেভাগেই অনলাইনে বিশেষ অনুমতিপত্র বা ক্লিয়ারেন্স পারমিট সংগ্রহ করতে হবে। রয়টার্স ও গালফ নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো পবিত্র স্থানগুলোতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং হজযাত্রীদের একটি নির্বিঘ্ন সফরের অভিজ্ঞতা প্রদান করা।
সৌদি আরবের এই নতুন নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি হজযাত্রীকে তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের `ইলেকট্রনিক কন্ট্রোলড ড্রাগস সিস্টেম` বা সিডিএস-এর মাধ্যমে আবেদন করতে হবে। হজযাত্রীদের প্রথমে এই সিস্টেমে একটি ব্যক্তিগত ট্রাভেলার অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। এরপর সেখানে প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র আপলোড করে অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে আবেদনকারীর পাসপোর্টের কপি এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক কর্তৃক ইস্যু করা একটি বৈধ মেডিকেল রিপোর্ট বা প্রেসক্রিপশন। উল্লেখ্য যে এই প্রেসক্রিপশনটি অবশ্যই আবেদনের তারিখের আগের ছয় মাসের মধ্যে ইস্যু করা হতে হবে। এছাড়া হজযাত্রীকে ওষুধের নাম এবং এর প্যাকেজিং বা মোড়কের পরিষ্কার ছবিও সিস্টেমে আপলোড করতে হবে।
ওষুধের পরিমাণের ক্ষেত্রেও এসএফডিএ কঠোর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী একজন হজযাত্রী তার মোট অবস্থানের সময়কাল অথবা সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে রাখতে পারবেন। অর্থাৎ কারও যদি ১৫ দিনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করার পরিকল্পনা থাকে তবে তিনি কেবল ওই ১৫ দিনের ওষুধই সঙ্গে নিতে পারবেন। কোনোভাবেই ৩০ দিনের বেশি সময়ের ওষুধ বহনের অনুমতি দেওয়া হবে না। সৌদি গেজেটের তথ্যমতে আবেদন করার সময় হজযাত্রীদের একটি ইলেকট্রনিক ডিক্লারেশন বা ঘোষণাপত্রে সম্মতি প্রদান করতে হবে যেখানে তারা স্বীকার করবেন যে এই ওষুধগুলো কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নেওয়া হচ্ছে।
এই নতুন নিয়ম চালুর পাশাপাশি ২০২৬ সালের হজের জন্য অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধিও কঠোর করা হয়েছে। সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে উন্নত কিডনি ফেইলর, হার্ট ফেইলর, লিভার সিরোসিস বা গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হজের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রাখা হতে পারে। এছাড়া সকল হজযাত্রীর জন্য মেনিনজাইটিস ভ্যাকসিন গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যা ভ্রমণের অন্তত ১০ দিন আগে নিতে হবে। মূলত তীব্র গরম এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েতে কোনো ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতেই এই ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হচ্ছে। যারা নিয়মিত ইনসুলিন বা ব্যথানাশক ওষুধ ব্যবহার করেন তাদের জন্য এই পারমিট প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ পারমিট ছাড়া বিমানবন্দরে ওষুধ জব্দ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে হজযাত্রীরা যেন তাদের ফ্লাইটের অন্তত দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগেই এই সিডিএস সিস্টেমে আবেদন সম্পন্ন করেন। কারণ পারমিট অনুমোদনে কিছুটা সময় লাগতে পারে। অনুমোদনের পর সেই পারমিটের একটি কপি প্রিন্ট করে মূল ওষুধের প্যাকেটের সাথে বহন করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি কোনো হজযাত্রীর অবস্থানের মাঝপথে ওষুধ শেষ হয়ে যায় তবে তাকে সৌদি আরবের কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত চিকিৎসক দেখিয়ে নতুন প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হবে। সৌদি আরবের এই কঠোর তদারকি ব্যবস্থা হজযাত্রীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকারই একটি অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
