ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় নিরাপত্তা জোরদার করতে ২০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ানতোর বিরুদ্ধে গোপন নজরদারি বা ফোন ট্যাপিংয়ের অভিযোগে তিন পুলিশ জেনারেলকে ঘিরে তদন্তের মধ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর অপারেশনস বিষয়ক সহকারী চিফ অব স্টাফ ভাইস অ্যাডমিরাল ইয়ান সোফিয়ান জানান, রাজধানী বাইরের এলাকা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার সাতশ সেনা বুধবার এসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে সোমবার জাকার্তায় মোতায়েন ইউনিটগুলো থেকে প্রায় দুই হাজার একশ সেনা মোতায়েন করা হয়।
এছাড়া স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে অতিরিক্ত তেরো হাজার একশ চল্লিশ জন সদস্য। সবমিলিয়ে এই সেনা মোতায়েন পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে কুড়ি হাজার নয়শ আশি জন সেনা। এই বাহিনীর মধ্যে রয়েছে মেরিন ও নৌবাহিনী ইউনিট, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং জাভা ও প্রদেশিক লা Lampung-এর বিভিন্ন নৌঘাঁটি।
চলমান এই ফোন ট্যাপিং তদন্তের সঙ্গে সেনা মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক কোনো যোগসূত্রের কথা জানাননি দেশটির কর্মকর্তারা। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আন্তারকে সামরিক মুখপাত্র মেজর জেনারেল মুহাম্মদ নাস জানান, জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষায় সেনা মোতায়েন একটি সাধারণ প্রক্রিয়া।
মঙ্গলবার সাবেক জাতীয় পুলিশ প্রধান লিসতিয়ো সিত প্রাবোও এবং অন্য দুই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার গ্রেপ্তারের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তদন্তকারীরা তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের প্রধানদের টার্গেট করে নজরদারি চালানোর অভিযোগ তুলেছেন।
জাকার্তার রাষ্ট্রীয় প্রাসাদে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় সচিব প্রাসেত্যো হাদি এই গোপন নজরদারিকে মুষ্টিমেয় কিছু বিপথগামী ব্যক্তির চালানো একটি অসাধারণ ঘটনা বলে অভিহিত করেন। তিনি জানান, এটি রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল হতে পারে এবং রাষ্ট্রের প্রধানের গোপনীয়তার তথ্য ফাঁস হলে তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
হাদি জানান, নিজের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি প্রাবোও। এই মামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ তিনি পুলিশ প্রধানকে দিয়েছেন। এর আগে পুলিশ প্রধানের পদ হারানোর পর মাত্র এক মাসের বেশি সময় দায়িত্ব পালন শেষে রাষ্ট্রপতির চিফ অব স্টাফের পদ থেকেও লিসতিয়োকে অপসারণ করা হয়।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী লিসতিয়ো এবং অপর দুই জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এএসএন ও ইএইচ-এর সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত দশজন সাক্ষী ও তিনজন বিশেষজ্ঞকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং এগারোটি মোবাইল ফোন, একটি আইপ্যাড ও চারটি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে।
গণতন্ত্র পর্যবেক্ষণ সংস্থা লিংকার মাদানির প্রতিষ্ঠাতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রায় রাংকুতি জানান, এই গোপন নজরদারির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। তিনি জানান, এটি সুশাসন, ক্ষমতা দখল কিংবা জাতীয় পুলিশের ভেতরের পদের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
এই ঘটনাকে ইন্দোনেশিয়ায় গণতন্ত্রের ধারাবাহিক পশ্চাৎপসরণের অংশ হিসেবে দেখছেন রাংকুতি। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করা আইনি সংশোধনী এবং রাজনৈতিক পরিবারতন্ত্রকে প্রশ্রয় দেওয়া সাংবিধানিক আদালতের বিভিন্ন রায়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রায় প্রতিটি স্তরই এখন ক্ষমতাসীনাদের স্বার্থ রক্ষায় আপস করেছে বলে মন্তব্য করেন রাংকুতি। তিনি যোগ করেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
