বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে সরকারের মূল লক্ষ্য হলো একটি বৈষম্যহীন ও ইনক্লুসিভ সোসাইটি বা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য অর্জনে সংস্কৃতি চর্চাকে শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার এই মহাপরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
রেজাউদ্দিন স্টালিন মনে করেন যে কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড আমাদের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটাতে পারবে না। তাই প্রতিটি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক মানের বেশ কিছু আয়োজন রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সার্ক ফেস্টিভ্যাল, আন্তর্জাতিক আবৃত্তি উৎসব, নৃত্য সম্মেলন এবং জেলায় জেলায় নিয়মিত নাট্যোৎসব। এছাড়া দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা আয়োজনের পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
লোকজ সংস্কৃতি রক্ষায় একাডেমির পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত সৃজনশীল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে যার নাম পথে পথে সুর ভ্রমণ। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের বড় নদীগুলোতে একটি বিশেষ জাহাজ তৈরি করা হবে যেখানে অত্যাধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও থাকবে। জাহাজটি যখন যে অঞ্চলে নোঙর করবে, সেই অঞ্চলের স্থানীয় এবং হারিয়ে যাওয়া জনপ্রিয় গানগুলো সংগ্রহ করা হবে। স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠেই সেই গানগুলো রেকর্ড করে পরে ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচার করা হবে। সমতল অঞ্চলের জন্য পথে পথে গান শীর্ষক আরেকটি প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদের অপ্রচলিত সুর ও গান সংরক্ষণের কাজ চলবে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চিত্রশিল্পকে তুলে ধরতে চলতি বছর এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। এখানে এশিয়া ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য, আলোকচিত্র এবং নিউ মিডিয়া আর্ট প্রদর্শিত হবে। মহাপরিচালক মনে করেন এর মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পীদের সঙ্গে বৈশ্বিক শিল্পীদের একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাদার মেলবন্ধন তৈরি হবে। জেলায় জেলায় দক্ষ চিত্রশিল্পী তৈরির লক্ষ্যে দেশব্যাপী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে যেখানে জাতীয় পর্যায়ের সেরা ১০ জনকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাহিত্যের সঙ্গে চিত্রকলার মেলবন্ধন ঘটাতে ছবি ও কবিতা নামক একটি নতুন কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এখানে শিল্পীদের আঁকা ছবির ওপর ভিত্তি করে কবিরা কবিতা রচনা করবেন। এই অনন্য উদ্যোগটি শিল্প ও সাহিত্যের মধ্যে এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন এবং এস এম সুলতানের মতো বরেণ্য শিল্পীদের আদর্শকে সামনে রেখে তরুণ শিল্পীদের আন্তর্জাতিক মানের সৃজনশৈলী অর্জনে সহায়তা দেওয়া হবে।
গবেষণার ক্ষেত্রে শিল্পকলা একাডেমি এখন আরও বেশি সক্রিয় হচ্ছে। বিশেষ করে পটচিত্রের ইতিহাস, রিকশা আর্ট এবং ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা নিয়ে নতুন করে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেজাউদ্দিন স্টালিন জানান যে প্রযুক্তিনির্ভর নিউ মিডিয়া নিয়েও কাজ চলছে যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। সম্প্রতি পালিত হওয়া ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের বর্ণাঢ্য আয়োজনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন যে ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা হবে।
মহাপরিচালক তার বক্তব্যে সাংস্কৃতিক পর্যটনের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলোকে যদি পর্যটনবান্ধব করা যায় তবে তা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখবে। বিদেশি পর্যটকরা এদেশের লোকসংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হলে রাষ্ট্র লাভবান হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। এই সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের সফলতায় তিনি দেশের গণমাধ্যমগুলোর ইতিবাচক ভূমিকার প্রত্যাশা করেন।
