ইউরোপের শক্তিশালী দেশ ফ্রান্সে রেকর্ড ভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে আকস্মিক বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে এবং দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে বলে বুধবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। তীব্র গরমের কারণে দেশটির জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ওপর ব্যাপক চাপ পড়ার ফলেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। ফরাসি আবহাওয়া অধিদপ্তর মেতেও ফ্রান্স জানিয়েছে যে দেশের অর্ধেকেরও বেশি এলাকা বর্তমানে সর্বোচ্চ স্তরের লাল সতর্কতার অধীনে রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং এর ফলে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। এই ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় ব্রিটানি এলাকার প্রায় ৬৮ হাজার বাড়িঘর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে বুধবার রাতের আগে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট authority স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই সমগ্র ফ্রান্স জুড়ে নজিরবিহীন তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে এবং সরকারি আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত মঙ্গলবার দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে গরম দিন হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ওই দিন দেশজুড়ে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা পূর্ববর্তী সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যান্ডস অঞ্চলের অন্তর্গত পিসোস এলাকায় গত মঙ্গলবার duperer দিকে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় যা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি স্থবির করে তুলেছে। এর আগে সোমবার দিবাগত রাতটি ছিল দেশটির ইতিহাসে এ যাবৎকালের সবচেয়ে উষ্ণতম রাত যেখানে পুরো দেশ জুড়ে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লা রোশেল শহরে স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটা বাজতেই তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে বলে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন।
তীব্র এই তাপপ্রবাহের কারণে ফ্রান্সে ইতোমধ্যে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ও মর্মান্তিক প্রাণহানির খবর সামনে এসেছে যা দেশবাসীকে শোকাহত করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত তাপপ্রবাহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পানিতে ডুবে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের হাত থেকে বাঁচতে এবং শরীর শীতল করার উদ্দেশ্যে নদী, লেক বা বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে নামার পর এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সলিলসমাধি ঘটে বলে সরকারি বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বিবেচনা করে মেতেও ফ্রান্স দেশের আরও ৪টি অঞ্চলকে নতুন করে লাল সতর্কতার অন্তর্ভুক্ত করেছে যার ফলে ফ্রান্সে মোট লাল সতর্কতার আওতাভুক্ত অঞ্চলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮টিতে। এর পাশাপাশি দেশের আরও ৩১টি অঞ্চলকে মাঝারি স্তরের বা তীব্র কমলা সতর্কতার অধীনে রাখা হয়েছে যাতে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়।
ফ্রান্সের এই ভয়াবহ তাপপ্রবাহ বর্তমানে পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং বুধবার নেদারল্যান্ডসের কিছু অংশে বিপজ্জনক আবহাওয়ার কারণে কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া বিভাগও দেশের কিছু অংশের জন্য একটি বিরল ও অত্যন্ত বিপজ্জনক লাল তাপ সতর্কতা জারি করেছে যেখানে আগামী বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের দেওয়া নতুন তথ্য অনুযায়ী আগামী শুক্রবার নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়ামে এই গরমের তীব্রতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি চলতি সপ্তাহান্তের মধ্যে ইউরোপের অন্যতম প্রধান দেশ জার্মানিতে আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে পারদ বেড়ে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে उन्नীত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে যা সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপ থেকে শুরু হওয়া এই তীব্র তাপপ্রবাহ আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করবে বলে আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলো সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইতোমধ্যে পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া এবং হাঙ্গেরির মতো দেশগুলোতে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে চরম গরমের পূর্বাভাসে তীব্র সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত চলমান এই নজিরবিহীন জলবায়ু সংকটের কারণে ফ্রান্স, স্পেন এবং ইতালি মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবহাওয়া ঠিক কখন পুরোপুরি স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাবে তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট অস্পষ্টতা রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষার্থে ফরাসি সরকার বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
