সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

রক্তসম্পর্কিত বিয়েতে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১, ২০২৬, ০২:০৫ পিএম

রক্তসম্পর্কিত বিয়েতে শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিতর্ক

রক্তসম্পর্কিত বা আপন কাজিনদের মধ্যে বিবাহের সামাজিক ও জিনগত প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ব্রিটেনের ব্র্যাডফোর্ড শহরে পরিচালিত দীর্ঘমেয়াদি ‍‍`বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড‍‍` গবেষণার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ এই আলোচনাকে আরও উস্কে দিয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ফার্স্ট কাজিন বা আপন চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো ও খালাতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের নির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্য ও বিকাশগত ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে এই সংবেদনশীল বিষয়টি কেবল চিকিৎসার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।

এই আধুনিক যুগেও কাজিন বিয়ের প্রথা অনেক সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত।

২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ব্র্যাডফোর্ড শহরের প্রায় ১৩ হাজার শিশুর ওপর পরিচালিত এই গবেষণাটি চিকিৎসা ইতিহাসের অন্যতম বড় বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। গবেষণার প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, যেসব দম্পতি সম্পর্কে আপন ফার্স্ট কাজিন, তাদের সন্তানদের ভাষা ও কথা বলার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি, যেখানে সাধারণ দম্পতিদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৭ শতাংশ। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন যে, বাবা-মা রক্তসম্পর্কিত হলে তাদের সন্তানদের সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিকল সেল ডিজিজের মতো মারাত্মক বংশগত রোগ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার আশঙ্কা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এমনকি পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের সরকারি মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাধারণ শিশুদের তুলনায় কাজিনদের সন্তানদের স্বাভাবিক বিকাশের হার প্রায় ১০ শতাংশ কম।

ঐতিহাসিকভাবে কাজিনদের মধ্যে বিয়ের প্রথা ইউরোপেও একসময় বেশ সাধারণ ছিল। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন তার আপন চাচাতো বোন এমা ওয়েডউডকে বিয়ে করেছিলেন এবং ব্রিটেনের রানি ভিক্টোরিয়াও তার আপন চাচাতো ভাই প্রিন্স আলবার্টকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে পশ্চিমা বিশ্বে এই হার মাত্র এক শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে মূলত যুক্তরাজ্যে বসবাসরত দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী এবং কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথাটি বেশি প্রচলিত। ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি সম্প্রদায়ের প্রায় ৪৬ শতাংশ মা তাদের ফার্স্ট কাজিনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ বলে গবেষণায় জানা গেছে।

তবে কিছু গবেষক মনে করেন, বংশগত রোগের জন্য কেবল কাজিন বিয়েই দায়ী নয়, বরং এর পেছনে ‍‍`এন্ডোগামি‍‍` বা একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মধ্যে বারবার বিয়ে হওয়ার প্রথা বড় ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘ সময় ধরে একই গোষ্ঠীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি হলে সাধারণ জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পুঞ্জীভূত হতে থাকে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই সমস্যাটি কেবল এশীয়দের মধ্যেই নয়, বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ইহুদি, অ্যামিশ এবং ফরাসি কানাডিয়ান সম্প্রদায়ের মধ্যেও সমানভাবে দৃশ্যমান।

জনস্বাস্থ্যের এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণে বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ ইতিমধ্যে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। নরওয়ে গত বছর কাজিনদের মধ্যে বিবাহকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেছে এবং সুইডেনও আগামী বছর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের আইন প্রণেতাদের একাংশ এই প্রথা নিষিদ্ধের পক্ষে সওয়াল করলেও বর্তমান লেবার সরকার জানিয়েছে যে তাদের এই মুহূর্তে আইনগত কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরিকল্পনা নেই। তারা মূলত ‍‍`জেনেটিক কাউন্সেলিং‍‍` বা সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার আলো এবং সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে এই প্রাচীন প্রথার ভিত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে আসছে। তরুণেরা এখন পরিবারের চেনা গণ্ডির বাইরে গিয়ে নিজেদের জীবনসঙ্গী বেছে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। চিকিৎসা সচেতনতা এবং সুস্থ সন্তান জন্মদানের আকাঙ্ক্ষাই সমাজ থেকে এই সামাজিক ও জিনগত জটিলতা দূর করতে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

banner
Link copied!