শিশুদের সবজি খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার বিষয়ে মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যে বিজ্ঞানভিত্তিক বেশ কিছু কার্যকরী উপায়ের কথা জানিয়েছে বিবিসি নিউজ। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের পর্যাপ্ত সবজি খাওয়াতে গিয়ে বেশ সমস্যার মুখোমুখি হন এবং শৈশবের এই খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে তাদের শরীরে প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে শিশুদের মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ খুব দ্রুত তৈরি হয় কারণ মায়ের বুকের দুধেও প্রাকৃতিক শর্করা থাকে যা এটিকে মিষ্টি স্বাদ দেয়। ফলে শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করার পর ব্রকলি বা পালং শাকের মতো সবজি তাদের খাওয়ানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ একটি বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকা শিশুদের বুদ্ধিমত্তা, মনোযোগ এবং আচরণের বিকাশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
পুষ্টিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে দুর্বল খাদ্যাভ্যাস শিশুদের জ্ঞানীয় ক্ষমতা, মনোযোগের অভাব এবং একাডেমিক পারফরম্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা ক্রমাগত বাড়ছে যা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য উদ্বেগের পাশাপাশি তাদের শিক্ষাগত ফলাফলের অবনতির সাথে জড়িত। এই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিগুলো এড়াতে গবেষকরা শিশুদের খাবারের অভ্যাস উন্নত করার জন্য নতুন কিছু উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করেছেন। বাবা-মায়েরা ঘরে বসেই এই সহজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করে শিশুদের সবজি খাওয়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন।
যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োসাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মারিয়ন হেদারিংটন জানান যে প্রাথমিক শৈশবে শিশুদের যত বেশি সম্ভব এবং বারবার বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়ানো উচিত। পাঁচ বছর বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের সবজির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে সফল সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে একটি নতুন খাবার গ্রহণ করার আগে শিশুদের অন্তত পাঁচ থেকে পনেরো বার সেটি দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা আরও কম হতে পারে কারণ তিন থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের নতুন খাবারের প্রতি এক ধরনের অনিহা বা ভয় কাজ করে। এমনকি শিশু জন্মের আগে মায়ের খাদ্যাভ্যাসও গর্ভস্থ শিশুর খাবারের পছন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পুষ্টি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বারবারা রোলস জানান যে খাবারের শুরুতে সবজি পরিবেশন করলে শিশুদের সেটি খাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। শিশুরা সাধারণত তাদের সবচেয়ে পছন্দের খাবারটি আগে খায় এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতিযোগিতায় সবজিগুলো পরে বাদ পড়ে যায়। তাই দুপুরের বা রাতের খাবারের শুরুতে যখন শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকে তখন সবজি দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। ওয়েস্টার্ন ডায়েটে প্রাতরাশে সবজি খাওয়ার চল না থাকলেও সকালের খাবারে ওমলেটের সাথে মাশরুম বা পালং শাক যুক্ত করা যেতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সকালের খাবারে সবজি দেওয়া হলে শিশুরা প্রায় ষাট শতাংশ সময়ই তা গ্রহণ করে।
খাবারের থালায় স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত উপাদানের অনুপাত কমিয়ে শিশুদের বেশি সবজি খাওয়ানো সম্ভব। গবেষণায় দেখা গেছে যে শিশুদের প্লেটে ফল ও সবজির পরিমাণপঞ্চাশ শতাংশ বাড়িয়ে দিলে তাদের সবজি খাওয়ার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। শিশুরা সাধারণত এমন খাবারের দিকে আকৃষ্ট হয় যা দেখতে পরিচিত এবং আকর্ষণীয় মনে হয়। যা কম স্পষ্ট তা হলো প্রতিটি শিশুর জন্য এই নিয়মগুলো ঠিক কতটা দ্রুত কাজ করবে কারণ শিশুদের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং পারিবারিক পরিবেশ ভিন্ন হয়। তবে ছোটবেলা থেকেই জোর না করে বারবার অভ্যাসের পরিবর্তন করলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যায় বলে গবেষকরা নিশ্চিত করেছেন।
