ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীরে চলতি জুন মাসে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সহিংসতা এবং অবৈধ জমি দখল তীব্রতর করেছে বলে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। ফিলিস্তিনি মার্কিন আইনজীবী আহমাদ ইব সাইসের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে যে বিশ্ববাসীর মনোযোগ যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির দিকে নিবদ্ধ রয়েছে তখন ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেব্রন শহরের কাছে সাত মাস বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু সাম ফাহদ আবু হাইকালকে ইসরায়েলি সৈন্যরা মুখে গুলি করে হত্যা করেছে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো এই ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর এড়িয়ে যাচ্ছে যার ফলে আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং মূল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো উপেক্ষিত থাকছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের সিঞ্জিল নামের একটি গ্রামকে কাঁটাতারের বেড়ায় অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে এবং সেখানকার ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের নিজস্ব কৃষিজমিতে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করছে এবং সামরিক বাহিনীর সরাসরি সুরক্ষায় স্থানীয় গ্রামবাসীদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানি চালাচ্ছে। গত বছরের অক্টোবর মাসে গাজায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে প্রতিদিন ইসরায়েলি বাহিনী চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। বসন্তকাল পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে যার ফলে অন্তত ৯৮১ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে একটি বড় অংশই নিষ্পাপ শিশু যারা নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষার চেষ্টা করছিলেন।
গাজা উপত্যকার সামগ্রিক ভৌগোলিক মানচিত্র পরিবর্তন করে ফিলিস্তিনিদের পরিকল্পিতভাবে ক্ষুধার্ত রাখার এক ভয়াবহ কৌশল ও জেনোসাইড বাস্তবায়ন করছে ইসরায়েল। গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাকে নতুন মানচিত্র পাঠিয়েছে যেখানে তারা গাজার মোট ভূমির ৫৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ শতাংশ এলাকা নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা দেখায়। মে মাসের শেষের দিকে একটি বিশেষ সম্মেলনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উগ্রপন্থী বসতিস্থাপনকারীদের সামনে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে তার সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা গ্রাস করেছে এবং তিনি ৭০ শতাংশ এলাকা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার নির্দেশ জারি করেছেন। বর্তমানে গাজার ফিজিক্যাল মানচিত্র এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে যার ফলে ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় প্রবেশ করতে পারছে না যার মধ্যে গাজার প্রধান কৃষিজমিগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারবে কি না কারণ ফিলিস্তিনের মূল সংকটকে আড়াল করতেই এই আঞ্চলিক যুদ্ধের আবহ তৈরি করা হয়েছিল। ফিলিস্তিনি কৃষকদের তাদের ফসলি জমিতে যাওয়ার সময় এবং স্থানীয় জেলেদের সাগরে মাছ ধরার সময় নিয়মিত গুলি করে হত্যা করছে ইসরায়েলি স্নাইপাররা। গাজার প্রধান সীমান্ত পারাপারগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও জরুরি সাহায্য সামগ্রী প্রবেশে চরম বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং একে ইসরায়েল তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অবাস্তব অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। নিহত ফিলিস্তিনি civilian বা বেসামরিক নাগরিকদেরও পরবর্তী সময়ে উগ্রপন্থী বা সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধের ঘটনাগুলোকে বিশ্বমঞ্চে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে গাজা উপত্যকাকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত করা হয়েছে। বিশ্বনেতারা যখন বড় বড় শান্তি চুক্তির ঘোষণা দিচ্ছেন তখন ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন এবং তাদের মৌলিক অধিকারগুলো কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
