যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের একটি ফেডারেল আদালতে ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যায় নিজের ভূমিকা গোপনের অভিযোগে এক ব্যক্তির বিচার শুরু হয়েছে। প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন যে ৫৫ বছর বয়সী চার সন্তানের জনক এবং মার্কিন নাগরিক এরিক নশিমিয়ে ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে সংখ্যালঘু তুতসিদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু হুতু চরমপন্থীদের দেশব্যাপী সহিংসতায় অংশ নেন। সে সময় প্রায় এক শ দিনে আট লাখেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তদন্তকারীরা ২০২৪ সালে ওহাইওতে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে নশিমিয়ে গ্রেপ্তার করেন। তাঁদের অভিযোগ, গণহত্যার সময় রুয়ান্ডায় তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তিনি তদন্তকারীদের কাছে মিথ্যা বলেছেন। তাঁরা আরও অভিযোগ করেন যে ২০১৯ সালে বোস্টনে এক বন্ধুর পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। প্রসিকিউটররা বলছেন যে বুতারে শহরের তৎকালীন মেডিকেল ছাত্র নশিমিয়ে তুতসিদের হত্যা ও ধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
সহিংসতায় অংশ নেওয়া হুতুরা তাদের প্রতিবেশীদের নির্মূল করার সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল বলে গত মঙ্গলবার আদালতে জানান সহকারী মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ক্রিস্টোফার লুনি। তিনি নশিমিয়েকেও সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করে বলেন যে তিনি তুতসিদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন এবং তাদের হত্যা ও ধর্ষণের জন্য তুলে দিয়েছিলেন।
২০১৯ সালের সাক্ষ্যের সময় নশিমিয়ে গণহত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি হুতুপন্থী ন্যাশনাল রেভোলিউশনারি মুভমেন্ট ফর ডেভেলপমেন্ট এবং ইন্টারহামওয়ে নামক আধাসামরিক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এই অস্বীকারের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং বিচারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করার উদ্যোগ নিতে পারে।
হুতু সম্প্রদায়ের সদস্য নশিমিয়ে দাবি করেন যে সহিংসতা শুরু হওয়ার আগে তিনি ছুটিতে রাজধানী কিগালিতে গিয়েছিলেন। বিশৃঙ্খলার কারণে তিনি আর বুতারে ফিরে যেতে পারেননি এবং একজন শরণার্থ হিসেবে দেশ ছেড়ে চলে যান। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এসে ২০০৯ সালে দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। মঙ্গলবার বিচার শুরুর দিনে নশিমিয়ে গাঢ় নীল রঙের স্যুট পরে উপস্থিত ছিলেন। তিনি শান্ত ছিলেন এবং মাঝে মাঝে পরিবার ও বন্ধুদের দেখে হাসছিলেন। গ্রেপ্তারের পর থেকে কর্তৃপক্ষ তাঁকে বোস্টন এলাকার একটি ফেডারেল কারাগারে জামিন ছাড়াই আটকে রেখেছে।
প্রসিকিউটররা ডজনখানেকের বেশি সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার পরিকল্পনা করেছেন, যাদের বেশিরভাগকেই রুয়ান্ডা থেকে বিমানে আনা হয়েছে। এসব সাক্ষী জানিয়েছেন যে তারা গণহত্যা শুরুর আগে নশিমিয়ে হুতুপন্থী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখেছিলেন এবং তাদের কেউ কেউ পরবর্তীতে বুতারে শহরে তাকে সহিংসতায় অংশ নিতে দেখেছেন।
নশিমিয়ের পরিবার বলছে যে ১৯৯৪ সালের ঘটনাগুলো হুতুদের তুতসি হত্যার সরল ব্যাখ্যার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। কেবল হুতু সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে কেউ গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল বলে জুরিদের বিশ্বাস করা উচিত নয় বলে সাংবাদিকদের জানান নশিমিয়ের ভাগ্নে এপা বিজিমানা। ১৯৯৪ সালে যখন তিনি পরিবারসহ রুয়ান্ডা থেকে পালিয়ে যান, তখন বিজিমানার বয়স ছিল ১০ বছর।
গত মঙ্গলবার আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান যে নশিমিয়ে গণহত্যায় অংশ নেওয়া হুতুদের দলে ছিলেন না। তারা বলেন যে এই মামলাটি প্রত্যক্ষদর্শীদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে, যাদের কেউ কেউ বারবার ছবি দেখানোর পরেই তাকে শনাক্ত করেছেন এবং কেউ কেউ পূর্ববর্তী বিচারগুলোতে ভিন্ন ধরনের সাক্ষ্য দিয়েছেন।
প্রতিরক্ষা আইনজীবী কার্ট কার্নস আদালতকে জানান যে গণহত্যার ২৫ বছর পর এরিক একজন চরিত্র সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার পরেই কেবল প্রসিকিউশনের মামলাটি সামনে আসে। কার্নস উল্লেখ করেন যে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা রুয়ান্ডার ভেতরের গাকাকা ট্রানজিশনাল জাস্টিস সিস্টেমসহ কোনো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে নশিমিয়ে কখনো অভিযুক্ত হননি।
