ধ্বংসস্তূপ থেকে গাজার হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিচিহ্ন রক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নেমেছেন একদল ফিলিস্তিনি প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্বেচ্ছাসেবী। অবরুদ্ধ উপত্যকাজুড়ে চলা দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানে প্রাণহানির পাশাপাশি ফিলিস্তিনের সমৃদ্ধ অতীতের প্রতিটি পদচিহ্ন মুছে ফেলার সংকট তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কালে উপত্যকার অন্তত ১৬৪টি প্রাচীন ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা বোমাবর্ষণে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
ইতিহাস রক্ষার এই লড়াই তাঁবুর ভেতরে চলছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় রয়েছে শতবর্ষী গ্রেট ওমারি মসজিদ, হাম্মাম আল-সাম্মারা, গাজা ওল্ড সিটির ঐতিহাসিক কাসর আল-বাশা দুর্গ এবং খান ইউনিসের নিকটবর্তী আল-কারারাহ জাদুঘর। সামরিক হামলায় উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা ৭৪ হাজার ২২ ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৮৪ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই চরম সংকটের মাঝে গাজার পাঁচ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার স্মারকগুলো অক্ষত রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে মায়াসিম অ্যাসোসিয়েশন ফর কালচার অ্যান্ড আর্টসের বিশেষ দল গার্ডিয়ানস অব হেরিটেজ।
সংস্থাটির সহকারী সমন্বয়কারী শাইমা মোহাম্মদ আল-নাতুর জানান, কার্যক্রম শুরুর পর থেকে চারটি ভিন্ন ভিন্ন জাদুঘরের সংগ্রহশালা থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ৭০০টির বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তারা নিরাপদে সরিয়ে আনতে পেরেছেন। তবে দলটির মূল কেন্দ্র এখন খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকার একটি শরণার্থী তাঁবু। বিশেষ রাসায়নিক বা যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট এবং অব্যাহত বাস্তুচ্যুতির কারণে উদ্ধার হওয়া প্রাচীন সামগ্রী সংরক্ষণ করা প্রতিদিনের একটি নতুন যুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইসরায়েলি বাহিনীর তথাকথিত হলুদ রেখা সংলগ্ন সামরিক নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও ওই সীমান্ত বলয়ে অন্তত ১৯৬ জন ফিলিস্তিনি সামরিক গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। আল-নাতুর স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রাচীন নিদর্শনের মূল্য অপরিসীম হলেও তাদের মূল নীতি মানুষের জীবনকে সবার আগে রাখা। যেসব ঐতিহাসিক এলাকা সম্পূর্ণভাবে সামরিক অবরোধের মধ্যে পড়েছে, সেখানে তাদের প্রবেশাধিকার এখন পুরোপুরি অসম্ভব।
মাঠপর্যায়ে স্থানীয় বাস্তুচ্যুত নাগরিকেরা ধ্বংসাবশেষের নিচে প্রাচীন কোনো মৃৎশিল্প বা ধাতব বস্তু খুঁজে পেলে তাৎক্ষণিকভাবে এই দলকে খবর দেন। গবেষকরা প্রথমে তথ্যদাতার নাম, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামগ্রীর প্রাথমিক অবস্থার একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করেন। এরপর ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে এনে কাঠের বাক্সে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়। ডিজিটাল নথির ব্যাকআপ হিসেবে তারা সাধারণ খাতায় কলমে প্রতিটি নিদর্শনের স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর লিখে রাখেন, যাতে বৈদ্যুতিক গোলযোগেও কোনো তথ্য হারিয়ে না যায়।
উপকূলীয় তাঁবুর আর্দ্র আবহাওয়া, লোনা বাতাস, পোকা-মাকড় এবং ঘন ঘন তাঁবু বদলের ঝাঁকুনিতে প্রাচীন মাটির পাত্রগুলো দ্রুত ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সাধারণ নরম তুলি দিয়ে উপরিভাগের ধুলা ঝেড়ে ফেলাই এখন তাদের একমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসা। আল-নাতুর জানান, এই মুহূর্তে নিদর্শনের ক্ষয় ঠেকিয়ে রাখাই তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। তবে এগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে প্রয়োজন তাপমাত্রা ও বাতাস নিয়ন্ত্রিত স্থায়ী গবেষণাগার এবং প্রতিরোধমূলক সংরক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। প্রাচীন পাথর উদ্ধারের পাশাপাশি দলটি এখন বাস্তুচ্যুত শিশু ও নারীদের মধ্যে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী মৌখিক ইতিহাস রক্ষার সচেতনতা তৈরির কর্মশালাও পরিচালনা করছে।
