সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ২৮ বৈশাখ ১৪৩৩

উশুয়াইয়া পর্যটন কেন্দ্রে হান্টাভাইরাস আতঙ্ক ও বিতর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১১, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম

উশুয়াইয়া পর্যটন কেন্দ্রে হান্টাভাইরাস আতঙ্ক ও বিতর্ক

পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তের শহর হিসেবে পরিচিত আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া এখন এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের কেন্দ্রে। এমভি হন্ডিয়াস নামক একটি ডাচ জাহাজে হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর থেকে শহরটির দিকে আঙুল তুলছেন অনেকে। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি উশুয়াইয়া বা তিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশে হান্টাভাইরাসের কোনো ঐতিহাসিক নজির নেই। এই শহরটি সাধারণত অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের প্রবেশদ্বার হিসেবে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এই বিতর্ক স্থানীয় পর্যটন শিল্পে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

এমভি হন্ডিয়াস জাহাজটি গত ১ এপ্রিল উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। এতে ১১৪ জন যাত্রী এবং ৬১ জন ক্রু ছিলেন। বর্তমানে জাহাজটি স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের তেনেরিফে বন্দরে অবস্থান করছে এবং সেখানে থাকা যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। ধারণা করা হচ্ছে জাহাজটিতে সংক্রমণ উশুয়াইয়া থেকেই ছড়িয়েছে। বিশেষ করে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি আবর্জনা ফেলার স্থান বা ল্যান্ডফিল সাইটকে সংক্রমণের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কেউ কেউ। বেনামে কিছু সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেছেন যে পর্যটকরা সেখানে পাখি দেখতে গিয়ে ইঁদুরের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন।

তবে এই অনুমানকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশের এপিডেমিওলজি ডিরেক্টর হুয়ান ফাকুন্দো পেত্রিনা। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে ১৯৯৬ সালে জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পর থেকে এই প্রদেশে হান্টাভাইরাসের একটি কেসও নথিবদ্ধ হয়নি। পেত্রিনা আরও ব্যাখ্যা করেন যে হান্টাভাইরাস বহনকারী নির্দিষ্ট প্রজাতির দীর্ঘ লেজযুক্ত ইঁদুর এই অঞ্চলে পাওয়া যায় না। তার মতে উশুয়াইয়ার জলবায়ু এবং তাপমাত্রা হান্টাভাইরাস বিস্তারের জন্য উপযুক্ত নয়। উত্তর প্যাটাগোনিয়ার এন্ডেমিক জোন থেকে উশুয়াইয়ার দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতাও একটি বড় বাধা।

পেত্রিনার এই দাবির সপক্ষে ভৌগোলিক যুক্তিও বেশ জোরালো। তিনি মনে করিয়ে দেন যে তিয়েরা দেল ফুয়েগো একটি দ্বীপ। ইঁদুরের পক্ষে ম্যাজেলান প্রণালী পাড়ি দিয়ে এই ভূখণ্ডে আসা প্রায় অসম্ভব। তবে আর্জেন্টিনার জাতীয় সরকার বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না। ইতিমধ্যেই বুয়েনস আইরেস থেকে বিশেষজ্ঞদের একটি দল উশুয়াইয়া পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই দলটি স্থানীয় ল্যান্ডফিল সাইটে ইঁদুর ধরার ফাঁদ পাতবে এবং ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখবে যে সেখানে সত্যিই হান্টাভাইরাসের কোনো চিহ্ন আছে কি না। যদিও এলাকাটি পরিদর্শনে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

বিপত্তি বাধে যখন প্রখ্যাত মহামারি বিশেষজ্ঞ এদুয়ার্দো লোপেজ পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তার মতে বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রাণী এখন তাদের আদি বাসস্থান ছেড়ে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে জানান যে দীর্ঘ লেজযুক্ত ইঁদুর যা আগে শুধু আন্দিজ অঞ্চলে দেখা যেত তা এখন বুয়েনস আইরেস প্রদেশেও পাওয়া যাচ্ছে। তাই উশুয়াইয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা পর্যটন খাতের জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।

উশুয়াইয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো পর্যটন এবং মাছ ধরা। তিয়েরা দেল ফুয়েগো ট্যুরিজম ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে অ্যান্টার্কটিকা অভিমুখী নৌযানগুলোর ৯৫ শতাংশই উশুয়াইয়া বন্দর ব্যবহার করে। বছরে প্রায় ৫০০টির বেশি জাহাজ এখানে নোঙর করে। যদি এই প্রাদুর্ভাবের দায় উশুয়াইয়ার ওপর বর্তায় তবে আন্তর্জাতিক পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। এই অর্থনৈতিক আশঙ্কাই স্থানীয় কর্মকর্তাদের এত দ্রুত এবং জোরালো প্রতিবাদ জানাতে বাধ্য করেছে। সত্য আসলে কী তা জানতে এখন জাতীয় বিশেষজ্ঞ দলের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা করতে হবে।

banner
Link copied!