শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইসলামি ইতিহাসে সমকামিতার সূচনা ও লূত সম্প্রদায়ের পরিণতি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ৩০, ২০২৬, ১১:৪২ পিএম

ইসলামি ইতিহাসে সমকামিতার সূচনা ও লূত সম্প্রদায়ের পরিণতি

পবিত্র কোরআন ও প্রামাণ্য ইসলামি ইতিহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, মানবসভ্যতায় সমকামিতার ইতিহাস সর্বপ্রথম শুরু হয়েছিল সাদ্দূম নগরীতে বসবাসকারী হজরত লূত (আ.)-এর সম্প্রদায়ের মাধ্যমে। তাফসির ইবনে কাসির এবং আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়ার ঐতিহাসিক তথ্যমতে, বর্তমান জর্ডান ও ফিলিস্তিন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী এই জাতি এমন এক জঘন্য পাপাচারের সূচনা করেছিল যা এর আগে পৃথিবীর কোনো মানুষ কখনো করেনি।

সাদ্দূম এবং এর আশপাশের জনপদের মানুষ শুধু এই বিকৃত যৌনাচারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে দস্যুবৃত্তি, ছিনতাই এবং নানাবিধ সামাজিক অপরাধে লিপ্ত ছিল। শয়তানের কুমন্ত্রণায় তারা সমকামিতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এটি তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা এই চরম সীমালঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘আমি লূতকে প্রেরণ করেছিলাম। যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বের কেউ কখনো করেনি। তোমরা কামপ্রবৃত্তি পূরণের জন্য নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে যাচ্ছ। প্রকৃতপক্ষে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী জাতি।’ (সুরা আরাফ: ৮০-৮১)

হজরত লূত (আ.) বছরের পর বছর ধরে তাঁর সম্প্রদায়কে এই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু অবাধ্য জাতি তাঁর কোনো কথাই শোনেনি। উল্টো তারা নবীকে উপহাস করে এবং নিজেদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করার হুমকি দেয়। তাদের দাম্ভিকতার চিত্র কোরআনে এভাবে এসেছে, ‘এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো নিজেদের খুব পবিত্র রাখতে চায়।’ (সুরা আরাফ: ৮২)

পাপাচারের চূড়ান্ত পর্যায়টি ঘটেছিল যখন আল্লাহর নির্দেশে সুদর্শন যুবকের বেশে কয়েকজন ফেরেশতা হজরত লূত (আ.)-এর বাড়িতে মেহমান হিসেবে আসেন। এই খবর পেয়ে পাপাচারী সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের ওপর চড়াও হওয়ার জন্য নবীর বাড়ি ঘেরাও করে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে হজরত লূত (আ.) অত্যন্ত অসহায় বোধ করেছিলেন। কোরআনে তাঁর সেই মানসিক যন্ত্রণার কথা এভাবে বর্ণিত হয়েছে, ‘লূত বললেন, হায়, তোমাদের বিরুদ্ধে যদি আমার শক্তি থাকত অথবা আমি কোনো সুদৃঢ় আশ্রয় গ্রহণ করতে পারতাম!’ (সুরা হুদ: ৮০)

এই অবাধ্য জাতির পতনের পেছনে খোদ নবীর স্ত্রীর ভূমিকাও ছিল বিশ্বাসঘাতকতার। তিনি ঈমান আনেননি এবং পাপাচারীদের এই জঘন্য কাজে মানসিক সমর্থন জুগিয়েছিলেন। এমনকি ফেরেশতাদের আগমনের খবরটিও তিনি ওই অপরাধীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ফলে আল্লাহর আজাব থেকে তিনিও রক্ষা পাননি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাকে ছাড়া; সে ছিল পেছনে থেকে যাওয়া লোকদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা হিজর: ৬০)

অবশেষে আল্লাহর নির্দেশ এলো। রাতের শেষ ভাগে হজরত লূত (আ.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে সাদ্দূম নগরী ত্যাগ করেন। এরপরই নেমে আসে ভয়াবহ আজাব। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অবশেষে যখন আমার আদেশ এলো, তখন আমি সেই জনপদকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পাথর বর্ষণ করলাম।’ (সুরা হুদ: ৮২) বহু ইসলামি ইতিহাসবিদের মতে, বর্তমান মৃত সাগর বা ডেড সি হলো সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত এলাকার ঐতিহাসিক নিদর্শন, যার অত্যধিক লবণাক্ততার কারণে সেখানে কোনো জলজ প্রাণী বাঁচতে পারে না।

কওমে লূত বা লূত সম্প্রদায়ের এই ঘটনা কেবল অতীতের কোনো সাধারণ গল্প নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত সব মানুষের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা। আধুনিক বিশ্বে যখন বিভিন্ন নামে এই বিকৃত রুচির প্রসার ঘটানোর চেষ্টা চলছে, তখন যা কম স্পষ্ট তা হলো মানুষ কেন অতীতের এই ভয়াবহ ঐতিহাসিক পরিণতি থেকে বারবার শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শেষ নবী রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমার উম্মতের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির আশঙ্কা করি, তা হলো লূত সম্প্রদায়ের কাজ।’ (ইবনে মাজাহ: ২৫৬৩) অন্য একটি বর্ণনায় তিনি এই কুকর্মে লিপ্ত ব্যক্তিদের ওপর আল্লাহর লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন। (আবু দাউদ: ৪৪৬২) ইসলামে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা স্বীকৃত হলেও তা কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক ও নৈতিক সীমারেখা লঙ্ঘনের অধিকার কাউকে দেয় না।

banner
Link copied!