ইসলামিক আইনশাস্ত্র বা ফিকহ কেবল কতগুলো নিয়মের সমষ্টি নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি জটিলতায় সঠিক পথ দেখানোর একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। সম্প্রতি আল-কাউসার ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত একটি লেকচারে ফিকহি মূলনীতি বা `কাওয়াইদুল ফিকহিয়া`র গুরুত্ব এবং এর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই পাঠে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কীভাবে একজন সাধারণ মুসলিম দালিলিক প্রমাণের অনুপস্থিতিতেও ফিকহি মূলনীতি ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন।
লেকচারটিতে ফিকহি মূলনীতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, এটি এমন একটি সাধারণ নিয়ম যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং যা থেকে সরাসরি আইনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। উসুলুল ফিকহ বা মূলনীতির সাথে এর পার্থক্য হলো—উসুলুল ফিকহ ব্যবহারের জন্য সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহর দলিলের প্রয়োজন হয়, কিন্তু ফিকহি মূলনীতি নিজেই একটি সিদ্ধান্তমূলক কাঠামো হিসেবে কাজ করে। এটি ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই বিশেষ পরিস্থিতিতে শরীয়াহর অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে।
সবচেয়ে পরিচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি ফিকহি মূলনীতি হলো: `নিশ্চয়তা সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না` (Certainty is not removed by doubt)। বক্তা একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। ধরুন, এক ব্যক্তি ফজরের সময় ওজু করেছিলেন এবং সারাদিন সেই ওজু দিয়ে নামাজ পড়েছেন। দিন শেষে তার মনে পড়লো যে তিনি ওজু ভেঙেছিলেন, কিন্তু ঠিক কখন ভেঙেছিলেন তা মনে নেই। এমতাবস্থায় ফিকহ বলে, কেবল এশার নামাজ পুনরায় পড়া তার জন্য বাধ্যতামূলক, কারণ তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে এশার সময় ওজু ছিল না। কিন্তু এর আগের নামাজগুলোর সময় ওজু ছিল কি না সে বিষয়ে কেবল সন্দেহ রয়েছে, আর সন্দেহ নিশ্চিত ওজু থাকার অবস্থাকে বাতিল করতে পারে না।
নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে সন্দেহের ক্ষেত্রেও এই মূলনীতির প্রয়োগ অনস্বীকার্য। নামাজের ভেতরে যদি কারো সন্দেহ হয় যে তিনি তিন রাকাত পড়লেন নাকি চার রাকাত, তবে তাকে ন্যূনতম সংখ্যা অর্থাৎ তিন রাকাতই ধরতে হবে এবং একটি অতিরিক্ত রাকাত পড়ে সাহু সেজদা দিতে হবে। কারণ তিন রাকাত পড়ার বিষয়টি এখানে নিশ্চিত, কিন্তু চতুর্থ রাকাতটি সন্দেহজনক।তবে যদি সালাম ফেরানোর পরপরই এমন সন্দেহ জাগে, তবে ফিকহ বলে যে যেহেতু তিনি নামাজের খুবই নিকটবর্তী অবস্থায় আছেন, তাই তাকে নামাজের ভেতরে থাকার মতোই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় রাকাত পূর্ণ করতে হবে।
এই ফিকহি মূলনীতিগুলো মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দান করে এবং শয়তানের প্ররোচনা বা `ওয়াসওয়াসা` থেকে দূরে রাখে। বক্তা জোর দিয়ে বলেন যে, ফিকহ কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের ইবাদতকে ত্রুটিমুক্ত করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
