আজ ১০ মে ২০২৬, মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার। সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মা দিবস। এই বছরের প্রতিপাদ্য হলো ‘মাতৃত্ব: ভালোবাসা ও যত্নে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা’। এই প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি শ্লোগান নয়, বরং এটি মায়েদের আজীবনের ত্যাগ, ধৈর্য এবং নিঃস্বার্থ স্নেহের এক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ইসলাম ধর্মে মাতৃত্বকে যে সুউচ্চ আসনে বসানো হয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো আদর্শ বা ব্যবস্থায় খুঁজে পাওয়া বিরল। ইসলাম মায়েদের কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের ফ্রেমে বন্দি করেনি, বরং প্রতিটি দিন ও প্রতিটি ক্ষণকে মায়ের সেবা ও সম্মানের জন্য উৎসর্গ করার নির্দেশ দিয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মায়েদের কষ্টের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। সুরা আহকাফের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে মা সন্তানকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং অতিকষ্টে প্রসব করেছেন। আবার সুরা লুকমানের ১৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে যে মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে সন্তানকে গর্ভে লালন করেন এবং দুই বছর পর্যন্ত দুধ পান করান। এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে একজন মানুষের অস্তিত্বের পেছনে মায়ের যে শারীরিক ও মানসিক ধকল, তার ঋণ কোনোভাবেই শোধ করা সম্ভব নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত—এই একটি বাক্যই মাতৃত্বের মর্যাদাকে মহিমান্বিত করার জন্য যথেষ্ট।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি বিখ্যাত হাদিস মায়ের শ্রেষ্ঠত্বকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এক সাহাবি যখন জানতে চাইলেন তার সুন্দর সাহচর্য পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকারী কে, তখন নবীজি (সা.) পর পর তিনবার ‘মা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। চতুর্থবারে তিনি বাবার কথা বলেন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে বাবার তুলনায় মায়ের অধিকার তিন গুণ বেশি। এই অধিকার কেবল মুখে স্বীকার করার বিষয় নয়, বরং বার্ধক্যে যখন মা অসহায় হয়ে পড়েন, তখন তার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ না করে পরম মমতায় আগলে রাখাই হলো প্রকৃত ইবাদত। ইসলাম শিখিয়েছে মায়ের সাথে ‘উফ’ শব্দটিও উচ্চারণ করা যাবে না।
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, অসংখ্য মহীয়সী নারী মাতৃত্বের মর্যাদা ও ত্যাগের মাধ্যমে অমর হয়ে আছেন। আদি মাতা হাওয়া (আ.) থেকে শুরু করে মারিয়াম (আ.), ইমরানের স্ত্রী হান্না, কিংবা প্রিয় নবী (সা.)-এর স্ত্রী উম্মাহাতুল মুমিনিন—প্রত্যেকেই মাতৃত্বের এক একটি অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন। এমনকি বড় পীর আবদুল কাদের জিলানি কিংবা বায়োজিদ বোস্তামির মতো আল্লাহর ওলিরা যে আধ্যাত্মিক শিখরে পৌঁছেছেন, তার মূলে ছিল তাদের মায়ের দোয়া ও আদর্শ লালন-পালন। মায়ের দোয়াই একজন মানুষকে কামিলিয়াতের মাকামে পৌঁছে দিতে পারে।
মা দিবসের আধুনিক ইতিহাসের সূচনা ১৯০৮ সালে অ্যানা জারভিসের হাত ধরে হলেও, জগতজুড়ে ‘মা’ ডাকের এক রহস্যময় সাদৃশ্য বিদ্যমান। ভাষাবিদদের মতে, শিশুরা যখন মায়ের দুধ পান করে, তখন মুখভর্তি অবস্থায় যে অস্ফুট শব্দ করে, তা অনেকটা ‘ম’ ধ্বনির মতো শোনায়। এই কারণেই বিশ্বের প্রায় সব ভাষায় মা ডাকটি ‘ম’ বা ‘M’ দিয়ে শুরু। যেমন ইংরেজিতে ‘মাদার’, জার্মান ভাষায় ‘মাট্টার’, ইতালিয়ান ভাষায় ‘মাদর’ কিংবা বাংলা ও হিন্দিতে ‘মা’। এই শব্দটির সাথে যে আবেগ ও আত্মার সম্পর্ক মিশে আছে, তা কবি জসীমউদ্দীনের ‘পল্লী জননী’ কবিতায় দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসে মায়ের সেই নির্ঘুম রাত কাটানোর দৃশ্যটি মাতৃত্বের চিরন্তন রূপ।
তবে আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির আড়ালে মাতৃত্বের কিছু করুণ রূপও আমাদের সামনে আসে। মমতাজ মহলের কথা ধরা যাক, যার স্মৃতিতে তাজমহল নির্মিত হয়েছে। সেই মমতাজ মহলের মৃত্যু হয়েছিল চতুর্দশতম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে। এটি যেমন ত্যাগের ইতিহাস, তেমনি মাতৃত্বের ঝুঁকিরও একটি বড় দলিল। দুঃখজনক হলো, আজকের ভোগবাদী সমাজে অনেক মা তাদের সন্তানদের জন্য জীবন বিলিয়ে দিলেও শেষ বয়সে এসে বড়ই একা হয়ে পড়েন। বৃদ্ধাশ্রমের দেয়ালগুলো যখন কোনো মায়ের কান্নায় ভারী হয়, তখন আধুনিক সভ্যতার মেকি উৎসবগুলো অর্থহীন মনে হয়। ইসলাম এই সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিরোধী এবং মায়েদের শেষ বয়স পর্যন্ত পরিবারের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার তাগিদ দেয়।
পরিশেষে, মা দিবসের এই আনুষ্ঠানিকতা যেন কেবল একদিনের উপহার বা সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে যে মায়ের সেবা করাই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ। করপোরেট কালচারের চাকচিক্য নয়, বরং অন্তরের গভীর থেকে মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং তার অধিকার নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কাজী কাদের নেওয়াজের সেই কবিতার মতো আমাদের অন্তরে মা যেন সর্বদা বিরাজ করেন এবং তার স্নেহের ধারা যেন আমাদের জীবনকে ধন্য করে। মায়ের সম্মান রক্ষা করা মানেই হলো একটি সুন্দর ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত গড়ে তোলা।
