সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক, যা স্থানীয়ভাবে আশ-শাম নামেও পরিচিত, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, আভিজাত্যপূর্ণ এবং ধারাবাহিক জনবসতিপূর্ণ নগরী। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দ থেকে বিভিন্ন সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত এই শহরটি আফ্রিকা ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এর সরু রাস্তা, প্রাচীন মোজাইক করা ভবন এবং জমজমাট বাজার আজও দর্শনার্থীদের এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। তবে ইসলাম, খ্রিস্ট এবং ইহুদি ধর্মে এই শহরটির গভীর আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ইসলামের বহু নবীর স্মৃতি ও পদচারণা এই শহরকে করেছে অনন্য।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, দামেস্ক বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী রাজধানী শহর। খননকার্যের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, এই অঞ্চলে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দেও মানববসতি ছিল। তবে আরামিয়ানদের আগমনের আগ পর্যন্ত শহরটি ইতিহাসের পাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে খুব একটা পরিচিতি পায়নি। মধ্যযুগে শহরটি তার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা এবং বিশেষ করে কারুশিল্পের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিল। কাব্যিকভাবে একে ‘জেসমিনের শহর’ বলা হয়, কারণ এর প্রতিটি অলিগলি এবং বাগানের দেওয়ালে সাদা জুঁই ফুলের সুবাস লেগে থাকে।
সিরিয়ার রাজধানী হিসেবে বর্তমানে এর আয়তন ১০৫ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। বারাদা নদীর দক্ষিণ তীরে প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত পুরাতন দামেস্ক শহরটি আজও তার ঐতিহাসিক মহিমা ধরে রেখেছে। অ্যাসিরিয়ান, ব্যাবিলনীয়, পার্সিয়ান, গ্রিক, রোমান এবং আরবদের মতো বিভিন্ন সাম্রাজ্যের শাসনকাল পার করা দামেস্ক আজ বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতার এক জীবন্ত জাদুঘর। ৬৬১ সালে উমাইয়া খেলাফতের সময় দামেস্ক সর্বপ্রথম রাজধানী হিসেবে মর্যাদা পায়, যা তার সমৃদ্ধির নতুন দ্বার উন্মোচন করে।
ইসলামিক ঐতিহ্য ও লোকবর্ণনায় দামেস্ক শহরের সঙ্গে মহান নবীদের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মহাপ্লাবনের পর হজরত নূহ (আ.)-এর দৃষ্টি এই অঞ্চলে পড়ার কথা লোকশ্রুতিতে শোনা যায়। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সিরিয়ায় হিজরতের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তার স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন আজও এই শহরে বিদ্যমান। এ ছাড়াও হজরত ইদরিস (আ.) এবং হজরত হুদ (আ.)-এর স্মৃতিধন্য স্থান হিসেবে দামেস্কের বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় ঐতিহাসিক বর্ণনায়।
৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত উমাইয়া মসজিদ বা গ্রেট মসজিদ অব দামেস্ক ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য স্থাপত্য। ঐতিহ্যের ধারক এই মসজিদে হজরত ইদরিস (আ.)-এর মাকাম এবং হজরত হুদ (আ.)-এর নামে একটি কূপ রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। মসজিদের অভ্যন্তরে হজরত ইয়াহিয়া (আ.)-এর পবিত্র মাজার অবস্থিত, যা মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় ধর্মের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার স্থান। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, শেষ জামানায় হজরত ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্ব দিকের সাদা মিনারে অবতরণ করবেন। উমাইয়া মসজিদের পূর্ব দিকের মিনারটি সাধারণত এই ভবিষ্যৎবাণীর স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার এবং এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার তথ্যমতে, দামেস্ক তার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে বিশ্বের মানবসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ।
