চলতি বছরের পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা সম্পাদনের অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ১৫ লাখেরও বেশি সমবেত মুসলমান মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে কাবার চারপাশ প্রদক্ষিণ বা তওয়াফ করছেন। ইসলামের এই পবিত্রতম স্থানটি সবসময় একটি বিশেষ সিল্কের তৈরি কালো কাপড়ে আবৃত থাকে, যা কিসওয়া বা কাবার গিলাফ নামে পরিচিত। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিম প্রতিদিন এই ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করলেও এই পবিত্র স্থাপত্যের অভ্যন্তরীণ গঠন ও ইতিহাস সম্পর্কে জানার আগ্রহ সবার মাঝেই প্রবল।পবিত্র কাবা শরিফের ভেতরের অংশ অত্যন্ত সাধারণ অথচ গম্ভীর স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত।
এর অভ্যন্তরীণ মেঝে এবং দেওয়ালগুলো মূলত মূল্যবান সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে সজ্জিত, যার সাথে সবুজ ও গাঢ় রঙের পাথরের নিখুঁত কারুকাজ রয়েছে। কাবার ছাদটিকে ধরে রাখার জন্য ভেতরে তিনটি শক্তিশালী কাঠের স্তম্ভ বা পিলার রয়েছে, যা অত্যন্ত প্রাচীন ও মজবুত কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এই দেওয়ালগুলোর ওপরের অংশে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত খোদাই করা প্রাচীন সুগন্ধিযুক্ত সিল্কের কাপড় বা পর্দা ঝুলিয়ে রাখা হয়। এছাড়া ঘরের ভেতরে একটি ছোট টেবিল আকৃতির টেবিল রয়েছে, যার ওপর বিভিন্ন সুগন্ধি তেল ও ঐতিহাসিক পাত্র রাখা থাকে।
বাইরে থেকে কাবা ঘরকে যে রেশমি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, সেই কিসওয়া প্রতি বছর হজের সময় পরিবর্তন করা হয়। এই গিলাফটি তৈরিতে প্রায় ৬৭০ কেজি খাঁটি সিল্কের সুতা ব্যবহার করা হয় এবং এর ওপর থাকা ক্যালিগ্রাফিগুলো ১২০ কেজি সোনা ও রুপার সুতা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। কিসওয়ার এই ঐতিহ্যবাহী কালো রঙ এবং কুরআনের সোনালী আয়াতের মিশ্রণ কাবা শরিফকে এক অনন্য আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও গাম্ভীর্য প্রদান করে।
আরবিতে কাবা শব্দের অর্থ ঘনক বা চতুষ্কোণ বিশিষ্ট ঘর, যা পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) এবং পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) দ্বারা পুনর্নির্মিত হয়েছিল। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ঘরটি আল্লাহর একত্ববাদের প্রতীক এবং পৃথিবীর সমস্ত মুসলিমের ঐক্যের কিবলা। কাবার দরজাটি মাটি থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে অবস্থিত এবং এটি সম্পূর্ণ খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যা কেবল বিশেষ রাষ্ট্রীয় অতিথি এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সময় খোলা হয়।
পবিত্র এই ঘরের অভ্যন্তরভাগ বছরে দুবার পরিচ্ছন্ন করা হয়, যেখানে জমজমের পানি এবং খাঁটি গোলাপ জল ও উদ ব্যবহার করা হয়। সৌদি আরবের বিশেষায়িত সরকারি ল্যাবরেটরিতে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে প্রতি বছর কিসওয়া তৈরি করা হয়, যা বিশ্ব মুসলিমের কাছে ত্যাগের এক অনন্য প্রতীক।
