বিশ্বকাপ মানেই সম্ভাবনা, নাটক আর অপ্রত্যাশিত ফলাফলের মঞ্চ। ২০২৬ আসর ঘিরেও সেই উত্তেজনার ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছে গ্রুপ সি-কে কেন্দ্র করে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল যেখানে দীর্ঘদিনের শিরোপা খরা কাটানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে, সেখানে তাদের পথ মোটেও সহজ নয়। মরক্কোর মতো উদীয়মান পরাশক্তি, দীর্ঘ বিরতির পর ফেরা স্কটল্যান্ড এবং বিশ্বমঞ্চে প্রায় হারিয়ে যাওয়া হাইতি সবাইই এই গ্রুপকে করে তুলেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। শক্তিমত্তায় এগিয়ে থাকলেও ব্রাজিলকে এখানে পড়তে হতে পারে কঠিন পরীক্ষায়, আর মরক্কো আবারও লিখতে পারে নতুন চমকের গল্প।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল এবারও এসেছে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো, রাফিনহা এবং তরুণ প্রতিভা এন্ড্রিককে ঘিরে গড়া আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষণভাগকে সমস্যায় ফেলতে সক্ষম। গতি, ড্রিবলিং আর ফিনিশিং সব মিলিয়ে এই ইউনিটকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বড় টুর্নামেন্টে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স কিছুটা অনিয়মিত। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে বারবার ব্যর্থতা তাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করেছে। নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে দলটি আরও সংগঠিত ও ভারসাম্যপূর্ণ ফুটবল খেলার চেষ্টা করছে। রক্ষণভাগে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই এখন মূল লক্ষ্য। দলের সবচেয়ে বড় শক্তি যেমন তারকা সমাহার, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও সেটাই। একাধিক সুপারস্টার থাকলেও তাদের একসাথে কার্যকর করা সহজ নয়। নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং তরুণদের গতি, এই সমন্বয়ই নির্ধারণ করবে ব্রাজিল কতদূর যেতে পারবে।
কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে মরক্কো দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে আফ্রিকান দলগুলো আর পিছিয়ে নেই। সেই সাফল্যের পর এবার তারা আরও আত্মবিশ্বাসী এবং পরিণত দল হিসেবে বিশ্বকাপে নামছে। আশরাফ হাকিমির মতো বিশ্বমানের ফুলব্যাক তাদের রক্ষণ ও আক্রমণ, দুই দিকেই ভারসাম্য এনে দিয়েছে। মাঝমাঠ ও রক্ষণে সংগঠিত কাঠামো তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্রাহিম দিয়াজের মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার যোগ হওয়ায় আক্রমণেও এসেছে নতুন মাত্রা। মরক্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তাদের ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিন। তারা শুধু প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না, বরং পরিকল্পিত ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। বড় দলের বিপক্ষে তারা কাউন্টার অ্যাটাক এবং দ্রুত ট্রানজিশনে ভরসা করে, যা ব্রাজিলের মতো আক্রমণাত্মক দলের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ জানানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। যদি তারা নিজেদের পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আবারও বড় চমক দেখানো একেবারেই অসম্ভব নয়।
২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা স্কটল্যান্ড গ্রুপ সি-তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হতে পারে। ইউরোপীয় বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা এই দলটি অভিজ্ঞতা ও শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। স্কট ম্যাকটমিনে তাদের সবচেয়ে বড় আক্রমণাত্মক অস্ত্র, যিনি মাঝমাঠ থেকে গোল করার সক্ষমতা রাখেন। পাশাপাশি অ্যান্ডি রবার্টসনের মতো অভিজ্ঞ ফুলব্যাক দলকে রক্ষণ ও আক্রমণে ভারসাম্য দেয়। স্কটল্যান্ড সাধারণত খুবই শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ডিফেন্সিভ স্ট্রাকচারে খেলে। তারা বড় দলকে চাপে ফেলার জন্য শারীরিক ফুটবল এবং সেট-পিসে ভরসা করে। যদিও ইতিহাস বলছে তারা এখনো বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব পেরোতে পারেনি, এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে ব্রাজিল ও মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচগুলো তাদের জন্য হবে কঠিন পরীক্ষা।
হাইতি এই গ্রুপের সবচেয়ে দুর্বল র্যাঙ্কিংয়ের দল হলেও তাদের গল্পই আলাদা। ১৯৭৪ সালের পর দীর্ঘ ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা তাদের জন্যই এক বিশাল অর্জন। বাছাইপর্বে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারিয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে তারা লড়াই করার মানসিকতা রাখে। দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আবেগ ও নির্ভার মানসিকতা। তাদের ওপর কোনো বড় প্রত্যাশা নেই, ফলে তারা মুক্তভাবে খেলতে পারবে। তবে বাস্তবতা হলো, অভিজ্ঞতা ও স্কিলের দিক থেকে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে। ব্রাজিল বা মরক্কোর মতো দলের বিপক্ষে টিকে থাকা তাদের জন্য কঠিন হবে। তবে একটি ড্র বা অপ্রত্যাশিত জয়ও পুরো গ্রুপের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। র্যাংকিং, অভিজ্ঞতা এবং স্কোয়াড শক্তির দিক থেকে ব্রাজিল ও মরক্কো স্পষ্টভাবে এগিয়ে। এই দুই দলের মধ্যেই মূলত নকআউট পর্বে যাওয়ার লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে স্কটল্যান্ডের শারীরিক ফুটবল এবং হাইতির অপ্রত্যাশিততা এই গ্রুপকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই চমক, তাই ব্রাজিলের জন্য প্রতিটি ম্যাচই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
