বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম অভিবাসীদের পুশইন: সীমান্তে মানবিক সংকট ও কূটনৈতিক উত্তেজনা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১০, ২০২৬, ১০:২২ পিএম

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম অভিবাসীদের পুশইন: সীমান্তে মানবিক সংকট ও কূটনৈতিক উত্তেজনা

ছবি : সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে নতুন করে শুরু হয়েছে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। সীমান্তের ওপারে ভারতের নতুন সরকারের গৃহীত নীতিমালার কারণে নথিপত্রহীন মুসলিম অভিবাসীদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে চরম মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে প্রতিদিন শত শত মানুষ আটকা পড়ছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই নথিপত্রহীন অভিবাসীদের শনাক্ত করে তাদের ফেরত পাঠানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কেবল মুসলিম অভিবাসীদের চিহ্নিত করা হয়েছে, যা স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ইতোমধ্যে কয়েক হাজার মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং প্রতিটি জেলায় আটক কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, এটি তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অংশ, তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পদক্ষেপকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক বলে সমালোচনা করেছে।

হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন অপেক্ষারত পরিবারগুলোর কষ্টের চিত্র ফুটে উঠছে। অনেক অভিবাসী অভিযোগ করেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে স্থানীয়দের হয়রানি ও পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে তারা স্বেচ্ছায় ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেউ কেউ আবার উন্নত জীবনের আশায় দালালদের মাধ্যমে সীমান্ত পার হলেও এখন তারা উভয় সংকটে পড়েছেন। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে এই মানুষগুলো এখন নো ম্যানস ল্যান্ড বা সীমান্ত চৌকিগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এই পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়ে সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড এবং ভারতের সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নির্বাসন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অনৈতিক হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইনি সুরক্ষা এবং নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ছাড়া যেভাবে মানুষকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থী। বিশেষ করে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে আলাদা করে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা, তা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা কেবল ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপরই প্রভাব ফেলবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

banner
Link copied!