জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা বা `স্ট্যাটাস কো` চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। অতি-ডানপন্থী ইসরায়েলি কট্টরপন্থিরা ক্রমাগত এই পবিত্র স্থলের প্রাচীন নিয়মকানুন ও আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো লঙ্ঘন করে চলেছেন। সম্প্রতি উগ্র ডানপন্থী ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ মোশে ফেইগ্লিন প্রায় বিশ জনের একটি দল নিয়ে আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে সেখানে প্রকাশ্যে ধর্মীয় গান ও প্রার্থনা সম্পন্ন করেছেন।
এই ঘটনাটি কয়েক দশকের পুরনো সেই সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক সমঝোতাকে সরাসরি অমান্য করে, যা এই পবিত্রতম স্থানে শান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। মোশে ফেইগ্লিন অত্যন্ত প্রকাশ্য ও খোলামেলাভাবে তার এই উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের পক্ষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে সাফাই গেয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, এই সমগ্র ভূমিটি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রধান অংশ এবং তারা এখানে একটি নতুন উপাসনালয় নির্মাণ করতে চান। তার এই বিস্ফোরক মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড মুসলিম বিশ্বে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। কারণ গত চৌদ্দশত বছর ধরে এই পবিত্র প্রাঙ্গণটি ইসলামের অন্যতম প্রধান ও সংরক্ষিত পবিত্র স্থান হিসেবে বিশ্ব মুসলিমের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত।
আল-হরম আল-শরিফ বা মুসলিমদের কাছে আল-আকসা নামে পরিচিত এই পঁয়ত্রিশ একরের বিস্তৃত প্রাঙ্গণটি মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পরিচিত এবং ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা। এর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সোনালী গম্বুজের ডোম অব দ্য রক বহুদূর থেকে দৃশ্যমান হয় এবং এটি জেরুজালেমের ঐতিহ্যের প্রধান প্রতীক। পবিত্র কুরআনেও এই ঐতিহাসিক মসজিদের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ রয়েছে এবং মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী এখান থেকেই মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) উর্ধ্বাকাশে বা মিরাজে গমন করেছিলেন। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী এই স্থানটি শুধুমাত্র মুসলিমদের ইবাদত ও সম্মিলিত প্রার্থনার জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
তবে বর্তমান সময়ে ইসরায়েলি কট্টরপন্থিদের প্রকাশ্য তৎপরতা এই চিরন্তন নিয়মকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে এই প্রাঙ্গণের নিচের অংশে অবস্থিত পশ্চিম দেয়াল ইহুদিদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয় যেখানে তারা প্রাচীন উপাসনালয় ধ্বংসের স্মরণে শোক প্রকাশ করেন। কয়েক দশক ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক সমঝোতার নিয়ম অনুযায়ী, আল-আকসা প্রাঙ্গণের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব জর্ডান প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত একটি স্বাধীন ইসলামিক বোর্ড বা ওয়াকফ কমিটির ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
এই নিয়মের অধীনে অমুসলিমরা একটি নির্দিষ্ট সময়ে পর্যটক হিসেবে এই পবিত্র প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করতে পারলেও সেখানে কোনো ধরনের ধর্মীয় আচার বা প্রার্থনা করার আইনি অনুমতি তাদের নেই। এমনকি ইসরায়েলের প্রধান রাব্বিনেট এবং অতি-অর্থোডক্স ইহুদি ধর্মগুরুরাও প্রাচীন ধর্মীয় আইনের দোহাই দিয়ে এখানে ইহুদিদের প্রার্থনার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছেন। তবে মোশে ফেইগ্লিনের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদীরা এখন এই সমস্ত ঐতিহ্যগত ও আইনি নিয়মকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে সেখানে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যৌথ গোপন তৎপরতায় এই ঐতিহাসিক স্থিতাবস্থা পুরোপুরি বাতিল করার একটি পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া চলছে বলে জোরালো দাবি উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই একাধিক নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, ইসরায়েল সরকার একটি নতুন administrative বা প্রশাসনিক সংস্থা গঠন করতে যাচ্ছে যা আল-আকসা প্রাঙ্গণকে একটি বহু-ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করবে।
এই ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে তা শত বছরের পুরনো মুসলিমদের একক ধর্মীয় অধিকারকে খর্ব করবে এবং সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদিদের বৃহৎ ধর্মীয় জামাত বা সম্মিলিত প্রার্থনার পথ তৈরি করবে। মার্কিন কংগ্রেশনাল শুনানিতে এই গোপন পরিকল্পনার বিষয়ে সম্প্রতি জানতে চাওয়া হলে বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান যে এই বিষয়ে তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই। তবে ইসরায়েলে নিযুক্ত প্রভাবশালী মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি অতীতে একাধিকবার জেরুজালেম এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের পবিত্র স্থানগুলোর সঙ্গে ইহুদিদের ঐতিহাসিক সংযোগের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো বক্তব্য রেখেছেন।
এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং জর্ডানের রাজপরিবার গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করে জানিয়েছে যে এই ধরনের কোনো পরিবর্তন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে চিরতরে ধ্বংস করতে পারে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই মুহূর্তে পুরো অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে একটি বড় ধরনের ধর্মীয় ও political বা রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে যা বিশ্ব শান্তির জন্য বড় হুমকি।
