সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

হাঙ্গেরির সংবিধান সংশোধন: সুলিওককে সরানোর আলটিমেটাম মাগিয়ারের

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

হাঙ্গেরির সংবিধান সংশোধন: সুলিওককে সরানোর আলটিমেটাম মাগিয়ারের

হাঙ্গেরির নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগিয়ার সাবেক পপুলিস্ট প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বানের শাসনামলে নিযুক্ত প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদ থেকে অপসারণের জন্য দেশের মূল আইন পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার রাজধানী বুদাপেস্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিওককে অর্বানের হাতের পুতুল হিসেবে আখ্যায়িত করেন। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানকে অবিলম্বে তার পদ থেকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। তবে নতুন প্রধানমন্ত্রীর এই দফায় দফায় জানানো অনুরোধ এবং চাপ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট।হাঙ্গেরির সংবিধান সংশোধন করার মাধ্যমে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের পথ খুঁজছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।

গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনে পিটার মাগিয়ার এবং তার নেতৃত্বাধীন টিসজা (Tizsa) পার্টি এক বিশাল ব্যবধানে ঐতিহাসিক জয় লাভ করে সরকার গঠন করে। বর্তমানে হাঙ্গেরির জাতীয় সংসদে মাগিয়ারের দলের দুই-তৃতীয়াংশ আসন বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, যার ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অর্বানের ১৬ বছরের দীর্ঘ শাসনামলে গড়ে তোলা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে তারা যেকোনো ধরনের আমূল পরিবর্তন আনার পূর্ণ আইনি ক্ষমতা রাখে। এই ক্ষমতার অংশ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রী মাগিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট সুলিওককে পদত্যাগ করার জন্য গত রবিবার পর্যন্ত একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বা আলটিমেটাম বেঁধে দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে সুলিওক স্বেচ্ছায় সরে না দাঁড়ালে তাকে সাংবিধানিক উপায়ের মাধ্যমে পদ থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হবে।

হাঙ্গেরিতে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত একটি আনুষ্ঠানিক বা আলংকারিক পদ হলেও তার হাতে পাস হওয়া যেকোনো আইন বা বিল চূড়ান্ত স্বাক্ষরের মাধ্যমে কার্যকর করার প্রধান দায়িত্ব থাকে। এর পাশাপাশি সংসদ কর্তৃক পাস হওয়া যেকোনো বিল বা আইনি প্রস্তাবনাকে গভীর পর্যালোচনার জন্য সরাসরি দেশের সাংবিধানিক আদালতে পাঠানোর বিশেষ ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির রয়েছে। নতুন সরকারের সমর্থকদের মনে এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট তার এই সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মাগিয়ার সরকারের আগামী দিনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বা বিল পাসের পরিকল্পনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারেন। এই সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়াতে সোমবার সকালে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন স্যান্ডর প্যালেসে তামাস সুলিওকের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী মাগিয়ার।

বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রেসিডেন্ট সুলিওক তার পদত্যাগের দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। মাগিয়ার বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান যদি তার এই অনড় অবস্থানে অটল থাকেন, তবে তিনি আজই টিসজা পার্টির সংসদ সদস্যদের কাছে তাদের নতুন আইনি প্রস্তাবনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করবেন এবং অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবেন। এই সামগ্রিক আইনি ও সংসদীয় প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় এক মাস সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো পূর্ববর্তী সরকারের আমলে যারা হাঙ্গেরির আইনের শাসন এবং গণতন্ত্রকে পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল, সেই সমস্ত বশংবদ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক পদ থেকে সম্পূর্ণ অপসারণ করা। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে হাঙ্গেরি কোনো একক ব্যক্তি, দল বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

তিনি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করেন যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী অর্বান যখন তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে চরম অমানবিক ও অবমাননাকর বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি পূর্ববর্তী সরকার যখন একটি এলজিবিটিকিউ (LGBTQ) প্রাইড ইভেন্ট নিষিদ্ধ করে বৈষম্যমূলক আইন পাস করেছিল, তখনও সুলিওক এর বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন। মাগিয়ার মনে করেন, প্রেসিডেন্টের এই দীর্ঘদিনের রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই সর্বোচ্চ পদের যে মর্যাদা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করা দেশের স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীর এই পদত্যাগের চাপ রাষ্ট্রপতির পদের সাংবিধানিক কার্যকারিতা এবং কর্তৃত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। এই আইনি দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে প্রেসিডেন্ট সুলিওক ইউরোপের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থা কাউন্সিল অব ইউরোপের আইনি বিশেষজ্ঞ দল ভেনিস কমিশনের কাছে একটি নিরপেক্ষ আইনি মূল্যায়নের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছেন।

banner
Link copied!