মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা ধনকুবের গুও ওয়েনগুইয়ের ৩০ বছরের কারাদণ্ড

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রে চীনা ধনকুবের গুও ওয়েনগুইয়ের ৩০ বছরের কারাদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালত সোমবার নির্বাসিত চীনা ধনকুবের গুও ওয়েনগুইকে এক বিলিয়ন ডলারের আর্থিক প্রতারণার দায়ে ৩০ বছরের জেল দিয়েছে বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। নিউইয়র্কের জেলা বিচারক অ্যানালিসা টরেস এই ঐতিহাসিক মামলায় গুও ওয়েনগুইয়ের কারাদণ্ড ঘোষণা করার সময় তার তীব্র সমালোচনা করেন। এক সময় চীনের অন্যতম শীর্ষ ধনী হিসেবে পরিচিত এই রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ২০১৪ সালে বেইজিং থেকে পালিয়ে ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একজন কট্টর সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক অনুসারী তৈরি করেন।

বিচারক অ্যানালিসা টরেস আদালতে রায় পড়ার সময় বলেন যে এই ব্যক্তি চীনের গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে তাদের সাথে প্রতারণা করেছেন। তিনি অনুসারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ নিজের বিলাসবহুল জীবনযাপনের পেছনে ব্যয় করেছেন যার মধ্যে রয়েছে একটি বিশাল প্রাসাদ, প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের লাল ল্যাম্বরগিনি, ৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ফেরারি গাড়ি এবং একটি ৩৭ মিলিয়ন ডলারের ইয়ট। মার্কিন প্রসিকিউটররা প্রমাণ করেছেন যে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গুও ওয়েনগুই তার নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ভুয়া ক্রিপ্টোকারেন্সি ও মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শত শত কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিলেন। আদালত তাকে কারাদণ্ডের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৮৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছে।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায় যে গুও ওয়েনগুই যুক্তরাষ্ট্রে মাইলস গুও এবং হো ওয়ান কোওক নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ও তার সহযোগীরা হিমালয় এক্সচেঞ্জ এবং জিটিভি মিডিয়া গ্রুপের মতো ভুয়া ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবাস্তব মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে ১,০০০ জনেরও বেশি সাধারণ বিনিয়োগকারীর জমানো অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। ভুক্তভোগীদের অনেকে আদালতে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে এই প্রতারণার কারণে তারা তাদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় হারিয়েছেন এবং সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বিচারক টরেস উল্লেখ করেছেন যে গুও ওয়েনগুই তার অপরাধের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি বরং আদালতের প্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি অসুস্থতার ভান করার চেষ্টা করেছিলেন। অন্যদিকে তার আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে তিনি চীনা সরকারের গোপন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে গুও ওয়েনগুই মার্কিন রাজনীতির উগ্র ডানপন্থী ও রক্ষণশীল শিবিরের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন যার মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন অন্যতম। তারা দুজনে মিলে ২০২০ সালে নিউ ফেডারেল স্টেট অফ চায়না নামের একটি অনলাইন প্রচারণা শুরু করেছিলেন যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বেইজিংয়ের শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করা। ২০২০ সালেই স্টিভ ব্যাননকে এই চীনা ধনকুবেরের বিলাসবহুল ইয়ট থেকে অন্য একটি জালিয়াতির মামলায় মার্কিন केंद्रीय গোয়েন্দারা গ্রেপ্তার করেছিলেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদের শেষ মুহূর্তে ব্যাননকে সাধারণ ক্ষমা করে দিলেও গুও ওয়েনগুই মার্কিন আইনি প্রক্রিয়া থেকে বাঁচতে পারেননি। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণের অর্থ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ভুক্তভোগীদের মধ্যে কীভাবে এবং কতদিনের মধ্যে বণ্টন করা সম্ভব হবে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুও ওয়েনগুইয়ের কারাদণ্ড ঘোষণার পর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে গুও ওয়েনগুই একজন চিহ্নিত অপরাধী এবং তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি রয়েছে। মার্কিন ফেডারেল সহকারী আইনজীবী রায়ান ফিনকেল আদালতে তাকে একজন চতুর প্রতারক ও চোর হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন যে বিপুল সম্পদ বা পরিচিতি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে পারে না। গুও ওয়েনগুইয়ের আইনজীবীরা অবশ্য জানিয়েছেন যে তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার পরিকল্পনা করছেন। এই মামলার রায় বিশ্বজুড়ে অনিয়ন্ত্রিত ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার এবং ভুয়া রাজনৈতিক প্রচারণার আড়ালে থাকা আর্থিক ঝুঁকিগুলোকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে যা অনেক বিনিয়োগকারীকে সতর্ক করবে।

banner
Link copied!