শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নকশালদের আদর্শিক হুমকি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির হুঁশিয়ারি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৫, ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম

ভারতের স্বাধীনতা দিবসে নকশালদের আদর্শিক হুমকি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির হুঁশিয়ারি

ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ঐতিহাসিক লালকেল্লার প্রাচীর থেকে দেশের ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের বিশেষ মুহূর্তে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেছেন। শনিবার আয়োজিত এই জাতীয় অনুষ্ঠানে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্যে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাওয়া মাওবাদী ও নকশালপন্থী বিদ্রোহ নির্মূল করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হয়েছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বক্তৃতায় স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, ভারত থেকে সশস্ত্র নকশালদের মূলোপাটন করা এখন অনেকটাই সম্ভব হয়েছে। বিগত কয়েক দশকে এই সশস্ত্র সংঘাতের কারণে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, বিদ্রোহী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের পর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘমেয়াদী সহিংসতা বহু প্রজন্মের তরুণদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিয়েছে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। তবে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাঠপর্যায়ে পতন ঘটলেও মতাদর্শগত সমর্থক ও বুদ্ধিজীবী মহল থেকে এখনো সুপ্ত হুমকি রয়ে গেছে বলে তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।

ভাষণে তিনি ‘দিমাগী নকশাল’ বা বুদ্ধিজীবী নকশাল পরিভাষাটি ব্যবহার করে জানান যে, এই মতাদর্শিক পেছনের কুশীলবরা এখনো সমাজের বিভিন্ন স্তরে সুযোগ সন্ধান করে যাচ্ছে। তারা নানা কৌশলে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, যা অবিলম্বে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, এই পরিভাষাটি মূলত সেই সমস্ত ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও সরকারের সমালোচক রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি ইঙ্গিত করে, যাঁদের অতীতেও ক্ষমতাসীন দল এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই অত্যন্ত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি এসেছে। ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের একটি নতুন প্রতিবাদী আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ‘কোকরোচ জনতা পার্টি’ নামক তরুণদের নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলন সরকারের বিভিন্ন নীতিমালার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং একপর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে বাধ্য করতে সফল হয়। যদিও প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে সরাসরি এই তরুণ আন্দোলনের নাম উল্লেখ করেননি, তবুও দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিনামূল্যে অনলাইন কোচিংয়ের মতো বিভিন্ন নতুন কর্মপরিকল্পনার কথা তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।

গত এক দশকে ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান যে, একসময়ের ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে দেশটি বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধমান প্রধান অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে। আগামী ২০৪৭ সালের মধ্যে, অর্থাৎ ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষ পূর্তির সোনালী ক্ষণে, দেশকে একটি সম্পূর্ণ উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। সরকারের বলিষ্ঠ নিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক নীতিমালার কারণেই মাওবাদী সহিংসতা ২০১৪ সাল থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে বলে তাঁর প্রশাসন দাবি করে আসছে।

তবে এই সাফল্যের দাবির বিপরীতে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘকাল ধরে সরকারের এই ধরনের কড়া অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে আসছে। তাদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, দেশদ্রোহের ধারা এবং বিদেশি অনুদান সংক্রান্ত কঠোর বিধিমালাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার কর্মী, স্বাধীন সাংবাদিক এবং সরকারের সমালোচনাকারী বিভিন্ন দলকে কোনঠাসা করা হচ্ছে। আল জাজিরা ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সরকারের এই কঠোর নীতির ফলে নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দাবির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিতর্কটি ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

banner
Link copied!