জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণের একাশিতম বার্ষিকীতে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বিতর্কিত ইয়াসুকুনী মন্দির পরিদর্শন করেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশ চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। রয়টার্স ও এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, যুদ্ধাপরাধীসহ দেশটির সামরিক সংঘাতে নিহতদের স্মরণে নির্মিত এই মন্দির পরিদর্শনের ফলে এশীয় ভূরাজনীতিতে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
টোকিওতে অবস্থিত ইয়াসুকুনী মন্দিরটি মূলত বিশ লাখের বেশি যুদ্ধনিহতের স্মরণে উৎসর্গীকৃত। এর মধ্যে ইম্পেরিয়াল জাপানের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন আগ্রাসনের সময় দোষী সাব্যস্ত হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই কারণে চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো বহু বছর ধরে এই মন্দিরটিতে জাপানি শীর্ষ রাজনৈতিক ও মন্ত্রীদের নিয়মিত পরিদর্শনকে সাম্রাজ্যবাদী অতীত লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা বলে অভিহিত করে আসছে।
শিনজিরো কোইজুমি শনিবার কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই মন্দিরটিতে উপস্থিত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরিদর্শন শেষে গণমাধ্যমের প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই তিনি স্থান ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি জানান যে, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তিনি এই পরিদর্শন করেছেন। যুদ্ধ ত্যাগের প্রতি তাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ জাতি হিসেবে জাপানের দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি ব্যক্তিগতভাবে মন্দিরটি পরিদর্শন করবেন বলে নানা জল্পনাকল্পনা চললেও তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত হননি। তবে সংবাদমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে যে প্রধানমন্ত্রী প্রথা অনুযায়ী মন্দিরটিতে একটি বিশেষ উপহার বা নৈবেদ্য পাঠিয়েছেন। অতীতে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বা দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে শিনজো আবে কিংবা অন্যান্য শীর্ষ নেতারাও অনুরূপভাবে নৈবেদ্য পাঠিয়েছিলেন।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার পর এক কঠোর প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে যে তারা জাপানি মন্ত্রীর এই সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর নৈবেদ্য পাঠানোর তীব্র নিন্দা জানায়। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জাপানি রাষ্ট্রদূতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র প্রতিবাদ ও অসন্তোষ জানানো হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে একে একটি অনৈতিহাসিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছে। সিউল সরকার জাপানি নেতাদের অতীত কর্মকাণ্ডের প্রতি প্রকৃত অনুশোচনা প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, বর্তমান আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের ঐতিহাসিক ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত এখনো সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে না যাওয়ায় জাপানি রাজনীতিবিদদের এই ধরনের পরিদর্শন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দেশটির আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করেছেন।
