শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩

তালেবান শাসনের পাঁচ বছর: আফগানিস্তানে সশস্ত্র বিরোধিতা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১৫, ২০২৬, ০৭:০৬ পিএম

তালেবান শাসনের পাঁচ বছর: আফগানিস্তানে সশস্ত্র বিরোধিতা

আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের ক্ষমতার প্রত্যাবর্তনের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। আল জাজিরা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে তালেবানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিরোধী দলগুলোর তৎপরতা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি ফ্রন্টে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন নামে ও ব্যানারে বেশ কয়েকটি গোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের অনলাইন প্রচারণাও লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এই ক্রমবর্ধমান সশস্ত্র ফ্রন্টগুলো কি প্রকৃত অর্থেই কোনো শক্তিশালী বিরোধিতার বিস্তার ঘটাচ্ছে, নাকি এর পেছনে রয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকট। গত আগস্ট মাসে পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। বিশেষ করে সম্প্রতি বাদাখশান প্রদেশের জেবাক জেলায় আফগান ফ্রিডম ফ্রন্টের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে যে সরকারের বিরোধিতাকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো সক্রিয় থাকলেও তারা দেশের ভূখণ্ডে তালেবানের নিয়ন্ত্রণকে বড় কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারেনি এবং কোনো সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড তাদের দখলে নেই।

কাবুলের পতনের পর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট বা জাতীয় প্রতিরোধ ফ্রন্ট ছিল প্রথম বড় ধরনের সশস্ত্র সংগঠন। সাবেক সরকারের পতনকালে সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাজধানী কাবুলের উত্তরে অবস্থিত পাঞ্জশির প্রদেশে সমবেত হয়েছিলেন। তারা এই উপত্যকাকে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে তালেবান একটি বড় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ওই প্রদেশের রাজধানী ও অধিকাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। পরবর্তীতে লড়াইটি বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও সীমিত পরিসরের সামরিক অপারেশনে রূপ নেয়।

নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক করিম আমিন আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে সাবেক আফগান সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে এই সশস্ত্র ফ্রন্টগুলো গঠনের চেষ্টা করেছিলেন। তবে তারা মাঠপর্যায়ে এই প্রকল্পগুলোকে কোনো প্রভাবশালী শক্তিতে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশই আফগানিস্তানের বাইরে গঠিত হয়েছিল, যার ফলে দেশের ভেতর তাদের কোনো শক্ত সামাজিক ভিত্তি গড়ে ওঠেনি। দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধের কারণে ক্লান্ত আফগান সমাজ নতুন করে কোনো সংঘাতের চক্রে জড়াতে রাজি নয়।

গবেষক করিম আমিন আরও উল্লেখ করেছেন যে এই বিরোধী শক্তিগুলো চার দশকের সংঘাতের পর আফগান সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিরোধিতাকে কেবল বিদেশ থেকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছে, যা সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও দেশের ভবিষ্যৎ রূপরেক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এ ধরনের আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। জনগণের আস্থা অর্জন এবং একটি বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক প্রকল্প উপস্থাপন করা ছাড়া কেবল বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

বাদাখশান প্রদেশে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর সশস্ত্র বিরোধিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে নানামুখী বিতর্ক শুরু হয়েছে। জুলাই মাসে আফগান ফ্রিডম ফ্রন্ট দাবি করেছিল যে তারা জেবাক জেলায় তালেবানের বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালিয়ে বেশ কিছু সামরিক চৌকি দখল করেছে এবং প্রতিপক্ষকে ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে তালেবান দাবি করেছে যে তারা ওই আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করেছে এবং বেশ কয়েকজন আক্রমণকারীকে নিবৃত্ত করেছে। বেশ কয়েক দিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর অবশেষে পরিস্থিতির তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পায়।

banner
Link copied!