রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক কুড়িল দ্বীপ সফরকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার জেরে জাপানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সাম্প্রতিক মন্তব্যের কঠোর প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই তলব করা হয়। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে যে মস্কোয় নিযুক্ত জাপানি রাষ্ট্রদূত আকিরা মুটো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হয়ে এই কঠোর বার্তার মুখোমুখি হন।
গত সপ্তাহে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সুদূর প্রাচ্যের বিতর্কিত কুড়িল দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান দ্বীপ ইচুরুপ সফর করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগে এই দ্বীপগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং তখন থেকেই টোকিও ও মস্কোর মধ্যে এই ভূখণ্ড নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক বিরোধ চলে আসছে। রাশিয়া এই দ্বীপগুলোকে দক্ষিণ কুড়িল হিসেবে অভিহিত করলেও জাপান একে নিজেদের উত্তর টেরিটরি বলে দাবি করে থাকে। রুশ প্রেসিডেন্টের এই সফরের পর জাপানি প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে একে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তিনি গণমাধ্যমের সামনে দাবি করেন যে এই ধরনের সফর জাপানি জনগণের ঐতিহাসিক অনুভূতিতে গভীর আঘাত হানে এবং দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথকে আরও কঠিন করে তোলে।
জাপানি প্রধানমন্ত্রীর এই ধরনের কঠোর অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছে মস্কো। রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাপানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে জানান যে কুড়িল দ্বীপপুঞ্জের ওপর রাশিয়ার নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ও আইনগত অধিকার সম্পূর্ণ অনস্বীকার্য। রুশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে দ্বীপগুলোর ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেকোনো অপচেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। এর আগে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও জাপানি নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তাদের এই ধরনের বক্তব্য কূটনৈতিক শালীনতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করেছে এবং টোকিওর সামরিকীকরণের প্রবণতা স্পষ্ট করে তুলেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটলেও কুড়িল দ্বীপপুঞ্জের অমীমাংসিত ভূখণ্ডগত বিরোধের কারণে রাশিয়া ও জাপান আজ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকে জাপান পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে একযোগে মস্কোর বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং কিয়েভকে রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, রুশ প্রেসিডেন্টের এই কুড়িল দ্বীপ সফর মূলত টোকিওর প্রতি একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত সতর্কবার্তা, যাতে জাপান ইউক্রেনকে সরাসরি প্রাণঘাতী সামরিক সহায়তা প্রদান বা ন্যাটো জোটের সাথে সামরিক সহযোগিতা অতিরিক্ত মাত্রায় বৃদ্ধি না করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যকার এই নতুন কূটনৈতিক বিরোধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
